সংগ্রামপুরের কালী মন্দির
বসিরহাটের সংগ্রামপুর গ্রাম, ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত এক পবিত্র স্থান, যা বহু প্রাচীনকালের ঐতিহ্য ও কিংবদন্তিতে ভরপুর। এই নদীর অপর প্রান্তেই রয়েছে সংগ্রামপুর কালীবাড়ি। কথিত আছে, এখানে মানসিংহ ও যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। সেই থেকেই এই অঞ্চলের নাম সংগ্রামপুর হয়ে ওঠে।
একদিন, কালীভক্ত রাজা কৃষ্ণচন্দ্র যখন ইছামতীর উপর নৌকো বিহারে বেরিয়েছিলেন, তখন সংগ্রামপুরের কাছে এসে তিনি নোঙর ফেলেন। রাতে স্বপ্নে তিনি এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখেন—ইছামতীর উত্তরের জঙ্গলের গভীর থেকে এক মায়াময় আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। রাজার মনে কৌতূহল জাগে এবং তিনি ভাবতে শুরু করেন, এই আলোর উৎস কি দেবীর কোনো ইশারা?
পরের দিন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র লোক-লস্কর নিয়ে সেই জঙ্গলে প্রবেশ করেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর, তিনি একটি কালীর মন্দিরের থানা আবিষ্কার করেন এবং সেখানে দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। কালক্রমে এই স্থানটি দক্ষিণাকালীর পুজোস্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং আজও সেখানকার পূজোর রীতি অবিকৃত রয়েছে।

পাঁচশো বছরের পুরনো ঐতিহ্য
সংগ্রামপুরের এই দক্ষিণাকালীর পুজো ইতিমধ্যেই পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়েছে। এত দিনের পুরনো এই মন্দির ও তার ইতিহাস নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে বহু কাহিনী ও বিশ্বাস গড়ে উঠেছে। তাদের মতে, মা কালী এখানকার সব ভক্তের প্রার্থনা শোনেন এবং রাত্রিবেলা লাল পাড় শাড়ি পরে মন্দির প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়ান।
পুজোর রীতি ও ভক্তদের আনাগোনা
সংগ্রামপুর কালীবাড়ির পুজোয় কিছু বিশেষ নিয়ম মেনে চলা হয়। শ্যামা পুজোর দিনেও মন্দিরের এক মাইলের মধ্যে অন্য কোনো প্রতিমা গড়ে পূজা করা হয় না। প্রাচীন রীতি অনুযায়ী, দক্ষিণাকালী পুজোয় মাটির হাঁড়িতে ভোগ রান্না হয়। ভোগে মটর ডাল, কচুর মুখী আর এঁচোড়-চিংড়ির সঙ্গে সাদা ভাত দেওয়া হয়।
শ্যামা পুজোর বিশেষ দিনে এখানে প্রচুর মানুষের ভিড় হয়। পাঁঠা বলির আয়োজন দেখতে হাজারো ভক্ত মন্দিরে সমবেত হন। ভক্তদের বিশ্বাস, এই পুজোতে যোগ দিলে তাদের মানত পূর্ণ হয়। তাই বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, এমনকি বহিরাগত ভক্তেরাও সারা বছর এখানে পুজো দিতে আসেন।
এইভাবে, সংগ্রামপুর কালীবাড়ির কালীপুজো শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি পুরান ও কিংবদন্তির সাথে মিশে থাকা এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যা ভক্তদের মনকে গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থার সঙ্গে পূর্ণ করে রেখেছে।