শিকলে বাঁধা ১৬০০ বছরের দেহাবশেষ!
প্রায় ১৬০০ বছর আগের এক রহস্যময় দেহাবশেষ নতুন করে প্রশ্ন তুলছে প্রাচীন খ্রিস্টধর্মের রীতিনীতি নিয়ে। Jerusalem-এর এক প্রাচীন বাইজেন্টাইন মঠে পাওয়া এই নিদর্শন শুধু প্রত্নতাত্ত্বিকদের নয়, ইতিহাসবিদদেরও ভাবিয়ে তুলেছে।
গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায় দেহাবশেষটি। সময়ের ভারে তা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল যে, প্রথমে লিঙ্গ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। শিকড়ের সঙ্গে প্রায় মিশে যাওয়া হাড়গোড়, ভাঙাচোরা অবস্থা—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক কঠিন ধাঁধা।
সম্প্রতি গবেষণার মাধ্যমে সেই ধাঁধার কিছুটা সমাধান হয়েছে। ‘জার্নাল অফ আর্কিয়োলজিক্যাল সায়েন্স’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা বলছে, এই দেহাবশেষ কোনও পুরুষের নয়, বরং এক নারীর। আর এই তথ্যই বদলে দিচ্ছে বহুদিনের প্রচলিত ধারণা।
এতদিন ধরে মনে করা হত, প্রাচীন খ্রিস্টীয় তপস্যা—বিশেষত কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মপীড়নের মতো চরম অনুশীলন—মূলত পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এই আবিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে, নারীরাও সমানভাবে এই কঠোর সাধনায় অংশ নিতেন।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা দেহাবশেষ থেকে মাত্র তিনটি কশেরুকা (মেরুদণ্ডের হাড়ের অংশ) এবং একটি দাঁত উদ্ধার করতে পেরেছিলেন। সেই দাঁতের এনামেলে থাকা ‘অ্যামেলোজেনিন’ নামের একটি প্রোটিন বিশ্লেষণ করে লিঙ্গ নির্ধারণ করা হয়। এই প্রোটিনের গঠনে নারী ও পুরুষের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এখানে ওয়াই ক্রোমোজ়োমের কোনও চিহ্ন নেই—যা সাধারণত পুরুষদেহে পাওয়া যায়। ফলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এটি এক নারীর দেহাবশেষ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তবে গবেষকরা সতর্কও করছেন—এটি শতভাগ নিশ্চিত নয়। এত পুরনো নমুনায় সময়ের প্রভাবে কিছু উপাদান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবুও, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নারীর উপস্থিতিই সবচেয়ে জোরালো সম্ভাবনা।
এই দেহাবশেষের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তার অবস্থান। শিকলে বাঁধা দেহ, দীর্ঘ অনাহার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের চিহ্ন—সব মিলিয়ে বোঝা যায়, এটি কোনও স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। বরং ইচ্ছাকৃতভাবে কঠোর তপস্যার অংশ হিসেবে এই অবস্থায় নিজেকে বেঁধে রাখা হয়েছিল।
প্রাচীন খ্রিস্টধর্মে এই ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মপীড়নের প্রথা একেবারে অজানা নয়। ইতিহাসে এমন বহু সাধকের উল্লেখ রয়েছে, যাঁরা শরীরকে কষ্ট দিয়ে আত্মার পরিশুদ্ধির চেষ্টা করতেন। উপোস, ধ্যান, নিঃসঙ্গতা—এসব ছিল তাদের সাধনার অঙ্গ। তবে চরম পর্যায়ের আত্মনির্যাতন নিয়েও তখন থেকেই মতভেদ ছিল।
এই নতুন আবিষ্কার দেখাচ্ছে, সেই কঠোর সাধনার পথ শুধু পুরুষদের জন্য ছিল না। নারীরাও সেই পথে হেঁটেছেন—সম্ভবত একই বিশ্বাস, একই আত্মনিবেদন নিয়ে।
ফলে এই দেহাবশেষ শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, বরং ইতিহাসের এক নতুন জানালা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অতীতের সমাজ অনেক বেশি জটিল, বহুস্তরীয় এবং বিস্ময়কর ছিল—যেখানে লিঙ্গভেদ অনেক সময়ই আমাদের ধারণার মতো সরল ছিল না।
শেষ লড়াইয়ের গল্প: জল থেকে তোলার পরও বেঁচে ছিলেন রাহুল, তবু বাঁচানো গেল না