লাল, নীল, সবুজ অসুরের মেলা! দুর্গাপুজোয় খলনায়কই কেন বাঙালির ছোটবেলার নায়ক?

দুর্গাপুজোয় খলনায়কই কেন বাঙালির ছোটবেলার নায়ক? দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দেবী দুর্গা, তাঁর চার সন্তান এবং বাহন— সব মিলিয়ে এক পরিচিত ছবি। কিন্তু সেই ছবির মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র কার? উত্তরটা অনেক…

October 10, 2026
1 min read

দুর্গাপুজোয় খলনায়কই কেন বাঙালির ছোটবেলার নায়ক?

দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দেবী দুর্গা, তাঁর চার সন্তান এবং বাহন— সব মিলিয়ে এক পরিচিত ছবি। কিন্তু সেই ছবির মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র কার? উত্তরটা অনেক বাঙালির কাছেই সহজ: মহিষাসুর। কখনও টকটকে লাল, কখনও সবুজ, কখনও ধূসর বা কালচে রঙের অসুরের চেহারা যেন ঠাকুর দেখার অন্যতম আকর্ষণ। ছোটবেলায় অসুরের অস্ত্র, পেশিবহুল শরীর আর লড়াইয়ের ভঙ্গিতে মুগ্ধ হননি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই দুর্গাপুজোয় যাঁর পরাজয় অবধারিত, তিনিই অনেকের কল্পনায় হয়ে ওঠেন অন্য রকমের নায়ক।

দেবীর পায়ের নীচে অসুর এল কী ভাবে?

দুর্গাপ্রতিমার পায়ের নীচে মহিষাসুরের উপস্থিতি আজ পরিচিত দৃশ্য হলেও, এই রীতি সব যুগে একই রকম ছিল না। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক এবং পুরোহিত নবকুমার ভট্টাচার্যের মতে, গুপ্তযুগ পর্যন্ত দুর্গামূর্তির পায়ের নীচে অসুরের উপস্থিতি দেখা যেত না। পরে দুর্গার ভাবনার সঙ্গে চণ্ডীর আখ্যানের মেলবন্ধন ঘটলে আহত মহিষাসুরের মূর্তি প্রচলিত হয়।

‘অসুর’ শব্দটির অর্থও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। বৈদিক সাহিত্যে দেবতা ও অসুরের সম্পর্ক সব সময় শত্রুতার ছিল না। গবেষক ওয়েন্ডি ডনিগারের ‘দ্য অরিজিনস অব ইভিল ইন হিন্দু মিথোলজি’ গ্রন্থেও প্রাচীন হিন্দু পুরাণে দেবতা ও অসুরের ধারণার বিবর্তন নিয়ে আলোচনা রয়েছে। পরবর্তী পুরাণে অসুরেরা দেবতাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। মহিষাসুরের কাহিনিও সেই সংঘাতেরই পরিচিত উদাহরণ।

অসুরও কি পুজো পান?

শুধু দেবী বা তাঁর সন্তানরাই নন, দুর্গাপুজোর আচারবিধিতে মহিষাসুরেরও নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে বলে জানিয়েছেন নবকুমার ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পুজোয় দেবী, তাঁর সন্তান, বাহন এবং অন্যান্য দেবতার উদ্দেশে নৈবেদ্য নিবেদনের পরে মহিষাসুরকেও নৈবেদ্য দেওয়া হয়। অর্থাৎ, প্রতিমায় পরাজিত অসুরের উপস্থিতি কেবল কাহিনির প্রয়োজনে নয়, পুজোর আচারেও তাঁর একটি ভূমিকা রয়েছে।

পালোয়ান থেকে ছয় প্যাকের অসুর

অসুরের চেহারার কোনও একটিমাত্র বাধ্যতামূলক শাস্ত্রীয় ছক নেই। সাবেকি একচালা প্রতিমায় লাল, সবুজ কিংবা ধূসর রঙের, পেশিবহুল পালোয়ানের মতো অসুর দেখা যায়। কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পী নিমাই পালের কথায়, এই পরিচিত চেহারাকে ‘বাংলা অসুর’ বলা হয়।

শিল্পী সমীর পালের কাছে অবশ্য অসুরের রঙের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাঁর ভঙ্গি। অসুরকে এমন ভাবে গড়তে হয়, যাতে একই সঙ্গে তাঁর শক্তি, যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং পরাজয়ের যন্ত্রণা ফুটে ওঠে। সাম্প্রতিক কালে সর্বজনীন পুজোয় জিমে তৈরি পেশিবহুল শরীরের অসুরের চাহিদা বেড়েছে। থিম পুজোর হাত ধরে লোকশিল্পের নানা আঙ্গিকও ঢুকে পড়েছে অসুরের নির্মাণে।

কখনও হিটলারের গোঁফ, কখনও ব্রিটিশ সেনা

সময় ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে অসুরের চেহারাও যে বদলেছে, তার নজির রয়েছে বাংলার প্রতিমাশিল্পে। শিল্প-ইতিহাসের অধ্যাপক দেবদত্ত গুপ্তের মতে, প্রতিমাশিল্পী গোপেশ্বর পাল এক বার মহিষাসুরের নাকের নীচে হিটলারের আদলে গোঁফ বসিয়েছিলেন। আবার ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরীর আত্মকথায় উঠে এসেছে, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তাঁদের বাড়ির দুর্গাপুজোয় অসুরের জায়গায় এক ব্রিটিশ সেনার আদলের মূর্তি ছিল।

থিম পুজোয় অসুরকে কখনও লোকশিল্পের চরিত্র, কখনও বা শিশুদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে থাকা এক মজার চরিত্র হিসেবেও দেখানো হয়েছে। ফলে মহিষাসুরের পরিচয় শুধু পরাজিত খলনায়কে আটকে নেই; শিল্পীর কল্পনায় তিনি নানা সময়ে নানা রূপ নিয়েছেন।

দশমীর অস্ত্রই ছোটদের ট্রফি

বাঙালির ছোটবেলার দুর্গাপুজোর স্মৃতিতে মহিষাসুরের অস্ত্রেরও বিশেষ জায়গা রয়েছে। দশমীতে প্রতিমার হাত থেকে অস্ত্র খোলা হলে অনেক শিশুরই নজর থাকে অসুরের তলোয়ারের দিকে। সেটি হাতে পাওয়া যেন ছোট্ট এক জয়। বিসর্জনের ভিড়, ঢাকের আওয়াজ আর সিঁদুরখেলার মধ্যে সেই অস্ত্র নিয়ে বাড়ি ফেরা— বহু মানুষের কাছে পুজোর স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

দেবী দুর্গা প্রতিবছর ফিরে আসেন, মহিষাসুরও ফিরে আসেন তাঁর সঙ্গে। কখনও লাল, কখনও সবুজ, কখনও অন্য কোনও রূপে। কাহিনিতে তিনি পরাজিত হলেও বাঙালির কল্পনায় তাঁর জনপ্রিয়তা অটুট। হয়তো সেই কারণেই দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দেবীকে প্রণাম করার পাশাপাশি অনেকের চোখ বার বার আটকে যায় অসুরের দিকেই।

রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *