রানির পছন্দ থেকে নবাবের আমবাগান— বাংলার আমের নামের পিছনে লুকিয়ে থাকা অজানা সব গল্প

রানির পছন্দ থেকে নবাবের আমবাগান! আমের নাম শুনলেই জিভে জল আসে। হিমসাগর, ফজলি, ল্যাংড়া, কোহিতুর— প্রতিটি নামের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে আলাদা স্বাদ, গন্ধ এবং ইতিহাস। বাংলার আম শুধু একটি ফল…

June 19, 2026
1 min read

রানির পছন্দ থেকে নবাবের আমবাগান!

আমের নাম শুনলেই জিভে জল আসে। হিমসাগর, ফজলি, ল্যাংড়া, কোহিতুর— প্রতিটি নামের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে আলাদা স্বাদ, গন্ধ এবং ইতিহাস। বাংলার আম শুধু একটি ফল নয়, বহু প্রজন্মের সংস্কৃতি, রাজকীয় ঐতিহ্য এবং লোককথারও অংশ।

কোনও আমের নাম এসেছে কোনও মানুষের নাম থেকে, কোনওটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নবাবি আমলের গল্প, আবার কোনও আমের পরিচয় তৈরি হয়েছে তার বিশেষ গুণের কারণে। আসুন, জেনে নেওয়া যাক এমনই কিছু পরিচিত ও অচেনা আমের নামের নেপথ্যের কাহিনি।

ফজলি: ফজলু বিবির আতিথেয়তা থেকে জনপ্রিয় আম

মালদহের বিখ্যাত ফজলি আমের নামের পিছনে রয়েছে এক জনপ্রিয় লোককথা। শোনা যায়, এক ব্রিটিশ কালেক্টর গৌড় যাওয়ার পথে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিলেন। গ্রামের এক মহিলা ফজলু বিবি তাঁকে নিজের বাগানের আম খেতে দেন। সেই আমের স্বাদে মুগ্ধ হয়ে সাহেবের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে ‘ফজলু বিবির আম’। সময়ের সঙ্গে তা বদলে হয় ‘ফজলি’।

লক্ষ্মণভোগ: চাষির নামেই পরিচিত

মালদহের জিআই ট্যাগ পাওয়া লক্ষ্মণভোগ আমের সঙ্গে রামায়ণের কোনও যোগ নেই। কথিত আছে, ইংরেজবাজারের চণ্ডীপুরের আমচাষি লক্ষ্মণ রায়ের বাগানেই প্রথম এই জাতের আম পাওয়া যায়। পরে তাঁর নামেই পরিচিত হয় ‘লক্ষ্মণভোগ’।

হিমসাগর: গরমে হিমেল অনুভূতির আম

বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় আম হিমসাগর। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, নবাবি আমলে এই আম খেলে শরীর ও মনে শীতল অনুভূতি হত। সেই ‘হিমেল’ অনুভূতি থেকেই নাকি নাম হয় ‘হিমসাগর’।

কোহিতুর: আমের জগতে রাজকীয় রত্ন

কোহিতুর আম এতটাই নরম ও সংবেদনশীল যে গাছ থেকে পাড়ার সময়ও বিশেষ যত্ন নিতে হয়। অনেক সময় তুলোর মধ্যে মুড়ে রাখা হয় এই আম। কথিত আছে, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার আমলে এর কলম তৈরি হয়েছিল। বিরল হিরে কোহিনুরের নাম অনুসরণ করেই এই আমের নামকরণ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

নবাবপসন্দ: রাজপরিবারের প্রিয় আম

মুর্শিদাবাদের নবাবি বাগানে জন্ম নেওয়া এই আম একসময় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। বিশেষ সুগন্ধ ও স্বাদের কারণে নবাবদের অত্যন্ত পছন্দের ছিল বলেই নাম হয় ‘নবাবপসন্দ’।

রানিপসন্দ: রানিদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য

নামেই লুকিয়ে রয়েছে এর ইতিহাস। কথিত আছে, নবাব পরিবারের রানিদের এই আম খুব প্রিয় ছিল। কারণ এর শক্ত শাঁসের জন্য খাওয়ার সময় হাতে বা মুখে অতিরিক্ত রস লাগত না। তাই রাজপরিবারের মহিলারা সহজেই এই আম উপভোগ করতেন।

ল্যাংড়া: এক সাধুর স্মৃতি

ল্যাংড়া আমের উৎপত্তি উত্তরপ্রদেশের বেনারসে হলেও বাংলাতেও এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, এক খঞ্জ সাধু তাঁর কুটিরে এই আমগাছের পরিচর্যা করতেন। তাঁর পায়ের সমস্যার কারণেই আমটির নাম হয় ‘ল্যাংড়া’।

গোলাপখাস: আমে গোলাপের সুবাস

গোলাপখাস আম কাটলেই পাওয়া যায় এক বিশেষ মিষ্টি গন্ধ। গোলাপজলের মতো সুবাসের কারণেই নবাবি আমলে এই আমের নাম হয় ‘গোলাপখাস’।

আম্রপালি: সৌন্দর্যের নামে আধুনিক সৃষ্টি

আম্রপালি কোনও প্রাচীন দেশি জাত নয়। কৃষিবিজ্ঞানীদের তৈরি দশেরি ও নীলম আমের সংকর এই জাতের নাম রাখা হয় বৈশালীর বিখ্যাত রাজনর্তকী আম্রপালির নামে। সৌন্দর্য ও গুণের মিল থেকেই এই নামকরণ।

মল্লিকা: শিল্পীর নামে আম

মল্লিকা আম তৈরি করেছিলেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। লেবু, তরমুজ ও মধুর মতো স্বাদের মিশেল রয়েছে এতে। কথিত আছে, এর নাম রাখা হয়েছিল বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী মল্লিকা সারাভাইয়ের নামে।

চৌসা: যুদ্ধের স্মৃতিও জড়িয়ে

বিহারের চৌসা অঞ্চলের নাম থেকেই এই আমের নাম। আবার একটি কাহিনি অনুযায়ী, ১৫৩৯ সালের চৌসার যুদ্ধে জয়লাভের পর শেরশাহ সুরি এই আম খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

গোপালভোগ: দেবতার ভোগের আম

মালদহের জনপ্রিয় গোপালভোগ আম নিয়ে প্রচলিত রয়েছে, কোনও এক জমিদার তাঁর গৃহদেবতা গোপালের ভোগের জন্য এই আম উৎসর্গ করেছিলেন। সেই থেকেই নাম হয় ‘গোপালভোগ’।

তোতাপুরী: আকৃতিতেই পরিচয়

তোতাপুরী আমের নিচের অংশ তোতাপাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো। সেই বিশেষ আকৃতির কারণেই এর নাম হয়েছে ‘তোতাপুরী’।

আশ্বিনা: শরতের শেষ আম

যখন অধিকাংশ আম বাজার থেকে বিদায় নেয়, তখনও গাছে থাকে আশ্বিনা। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে পাকে বলেই এর নাম হয়েছে ‘আশ্বিনা’।

বাংলার আমের এই গল্পগুলি মনে করিয়ে দেয়— প্রতিটি আমের স্বাদ যেমন আলাদা, তেমনই আলাদা তার ইতিহাস। তাই আম খাওয়ার আনন্দ শুধু রসনা তৃপ্তিতে নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শত বছরের গল্প জানাতেও।

রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *