মুম্বইয়ের লঞ্চডুবি
মুম্বইয়ের এলিফ্যান্টা গুহায় ভ্রমণরত একটি যাত্রিবাহী লঞ্চের মর্মান্তিক ডুবির ঘটনা এখনও মানুষের মনে দাগ কেটে আছে। নৌসেনার স্পিডবোটের সঙ্গে সংঘর্ষে লঞ্চটি ডুবে গেলে ১৪ জন প্রাণ হারান, এবং একটি শিশুর এখনও কোনও খোঁজ মেলেনি। এই ভয়াবহ ঘটনার সময়ে যাত্রীদের আতঙ্ক এবং তাদের সন্তানদের বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা তুলে ধরলেন সিআইএসএফ-এর এক উদ্ধারকারী জওয়ান।
আতঙ্কিত যাত্রীদের অমানবিক সিদ্ধান্ত
সিআইএসএফ-এর কনস্টেবল অমল সাভান্ত জানান, লঞ্চ ডোবার মুহূর্তে যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাব-মায়েরা ভেবেছিলেন, সন্তানদের সমুদ্রে ছুড়ে দিলে হয়তো তারা বেঁচে যাবে। কিন্তু সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলে দ্রুত উপস্থিত হন সিআইএসএফ এবং নৌসেনার জওয়ানরা। তাঁরা যাত্রীদের শান্ত করেন এবং দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করেন।
অমল বলেন, “আমরা উপকূলে টহল দিচ্ছিলাম। হঠাৎ ওয়াকিটকিতে খবর পেলাম, তিন-চার কিলোমিটার দূরে একটি লঞ্চ ডুবে যাচ্ছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমরা স্তব্ধ হয়ে যাই। বাবা-মায়েরা সন্তানদের বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায় তাদের জলে ছুড়ে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই দৃশ্য দেখে আমাদের ভয় লাগছিল। দ্রুত কাজ শুরু করি। প্রথমে শিশুদের, পরে মহিলাদের, এবং সবশেষে পুরুষদের উদ্ধার করি।”
ঘটনার দিন কী হয়েছিল?
বুধবার বিকেলে যাত্রিবাহী লঞ্চ “নীলকমল” এলিফ্যান্টা গুহায় ভ্রমণের জন্য যাত্রা করছিল। লঞ্চে মোট ১১৩ জন যাত্রী ছিলেন। নৌসেনার একটি স্পিডবোট হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়। সেই সংঘর্ষে লঞ্চটি ডুবে যায়।
দ্রুত উদ্ধারকাজের গল্প
অমল ও তাঁর দুই সহকর্মী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন, লঞ্চের অধিকাংশই ডুবে গেছে। যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার করছেন, কেউবা লঞ্চের ধ্বংসাবশেষে ঝুলে আছেন। অমল জানান, প্রথমে ছয় থেকে সাত জন শিশুকে উদ্ধার করা হয়। তাদের বাবা-মায়ের চোখে তখনও আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। একে একে মহিলা ও পুরুষ যাত্রীদের উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকাজে জওয়ানদের চ্যালেঞ্জ
ডুবন্ত লঞ্চের মধ্যে ঢুকে শিশুদের ঝুলে থাকতে দেখে জওয়ানরা শিউরে উঠেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি সামলে দ্রুত সবাইকে উদ্ধারের কাজ শুরু করেন। এই উদ্ধারকাজে প্রাণ হারানো ১৪ জনের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে একটি শিশুর কোনও খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি।
কেন ঘটল এমন দুর্ঘটনা?
দুর্ঘটনার জন্য নৌসেনার স্পিডবোটের থ্রটল সমস্যাকে দায়ী করা হচ্ছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, পরীক্ষামূলক স্পিডবোট চালানোর সময় এর চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ফলে এটি সোজা গিয়ে লঞ্চটিতে ধাক্কা মারে। মুম্বই পুলিশ এখন নৌসেনার কাছে এই প্রশ্ন তুলেছে যে, ব্যস্ত সময়ে পরীক্ষামূলক স্পিডবোট চালানোর অনুমতি কেন দেওয়া হয়েছিল।
অতিরিক্ত যাত্রী এবং সুরক্ষার অভাব
পুলিশ আরও খতিয়ে দেখছে যে, লঞ্চে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী তোলা হয়েছিল কি না এবং যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য লাইফজ্যাকেট দেওয়া হয়েছিল কি না।
মর্মান্তিক পরিণতি
এই দুর্ঘটনা শুধু ১৪টি প্রাণের মৃত্যু নয়, মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। সন্তানদের বাঁচানোর জন্য বাবা-মায়েদের অসহায়তা এবং উদ্ধারকারীদের বীরত্ব চিরকাল মনে থাকবে। এটি আমাদের সুরক্ষার নিয়ম মেনে চলার গুরুত্ব আরও একবার মনে করিয়ে দেয়।
এই লঞ্চডুবির ঘটনা একটি দুঃখজনক শিক্ষা হয়ে থাকবে। যাত্রী সুরক্ষা, সঠিক অনুমতি এবং নিয়ন্ত্রণের অভাব কীভাবে একটি প্রাণঘাতী বিপর্যয় ঘটাতে পারে, তা আমরা যেন ভুলে না যাই।