রূপালি পর্দার আড়ালে শিশুসত্তার নাম ছিল কামু মুখোপাধ্যায়
অভিনয়ের মূল চরিত্রে না থেকেও যিনি প্রতিটি দৃশ্যে আলাদা করে নজর কেড়েছেন, তিনি কামু মুখোপাধ্যায়। সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’য় মন্দার বোস, ‘নায়ক’-এ বিজ্ঞাপন সংস্থার মালিক প্রীতীশ সরকার কিংবা ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এ ক্ষুধার্ত সৈনিক—সব চরিত্রেই তাঁর নিজের মতো করে মিশে যাওয়ার দক্ষতা ছিল দুর্লভ। কিন্তু এই প্রথাগত নায়ক নন, বরং পরিচালকের নির্ভরযোগ্য “চরিত্র নির্মাতা”। একাধিক ছোট চরিত্রে তিনি এমন স্বতঃস্ফূর্ততা এনেছেন, যা আজও দর্শকের মনে অমলিন।
বিচিত্র বাচনভঙ্গি, চোখেমুখে দুষ্টু মিষ্টি ভাব আর স্বভাবজাত কৌতুকে মোড়া কামুর উপস্থিতি ইউনিটের মধ্যেও ছিল আলাদা। জৈসলমিরের শুটিং চলাকালীন সহ-অভিনেতার কাশিকে ‘খড়কাটা মেশিন’ বলার মতো অপ্রত্যাশিত উপমা দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন তিনি। আর সেসব ঘটনার নথিভুক্ত সাক্ষী সত্যজিৎ নিজেই।
তবে চরিত্রাভিনেতা হলেও, কামু ছিলেন দৃশ্যপটে অপার মোহের স্রষ্টা। তাঁর কণ্ঠের স্বরে যে নিজস্বতা ছিল, তা দিয়ে সাধারণ সংলাপকেও রসে টইটম্বুর করে তুলতেন। যেমন, ‘সে তো জং দেখেই বোঝা যাচ্ছে’ কিংবা ‘আখের শরবৎ, পূর্বজন্মে খেয়েছ ওই জিনিস?’—এই লাইনগুলো আজও জনপ্রিয় শুধু তাঁর বলার ঢঙের জন্য।
তাঁর অভিনয় ছিল পরিচালকের লেন্সে অনন্য। সেইজন্যই, যখন বড় চরিত্র না পাওয়ার হতাশা নিয়ে কামু বলেছিলেন, “মানিকদা, চরিত্র না থাকলে একটা দুশ্চরিত্র দিন”, তখন তার মধ্যে ছিল খানিক অভিমান, খানিক ভালোবাসার আবদার। সত্যজিৎ সেই আবেগ বুঝতেন বলেই ‘সোনার কেল্লা’র জটিল ট্রেন স্টান্ট নিজেই করার সুযোগ দিয়েছিলেন কামুকে।
‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ অর্জুন চরিত্রে তাঁর রূপান্তর ছিল অনবদ্য। তাঁর তেলতেলে শরীরী ভাষা, ক্লান্ত চোখ আর শীর্ণ মুখচ্ছবিতে ফুটে উঠেছিল এক ক্ষয়িষ্ণু নাইফ থ্রোয়ারের নিখুঁত ছায়া। পরিচালকরা যেখানে অনেক সময় মুখোশ চাপিয়ে চরিত্র বানান, সেখানে সত্যজিৎ ব্যবহার করতেন অভিনেতার নিজস্ব মুখচ্ছবিই। আর তাই কামুর মতো শিল্পীকে নিয়েও তৈরি করতে পারতেন শিল্প।
সত্যজিতের মৃত্যুর পরে নন্দনে প্রৌঢ় কামুকে শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখা গিয়েছিল। সেটাই প্রমাণ, এই সম্পর্কটা ছিল কেবল পেশাদার নয়—এক গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর হারানোর শূন্যতার আত্মিক প্রকাশ।
চরিত্র বড় হোক বা ছোট, কামুর অভিনয়ে ছিল পূর্ণতা। সেইজন্যই, বাংলা সিনেমায় যাঁরা পর্দার আড়ালে থেকেও পর্দা দখল করেন—তাঁদের তালিকায় কামু মুখোপাধ্যায়ের নাম থাকবে চিরস্থায়ী স্বাক্ষর হয়ে।
পাকা আমের স্বাদে অন্য রূপ! রুটির সঙ্গে জমবে এই ঝটপট আমের তরকারি