মঞ্চের নায়ক না হলেও হৃদয়ের নায়ক ছিলেন কামু
কথা বলার ধরণেই হাসি, সংলাপে চমক, চরিত্রে প্রাণ—এমনই ছিলেন কামু মুখোপাধ্যায়। ‘নায়ক’ থেকে ‘সোনার কেল্লা’, ‘ফটিকচাঁদ’ থেকে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’—বাংলা সিনেমার বহু স্মরণীয় মুহূর্ত তাঁর উপস্থিতিতে হয়ে উঠেছে অনন্য।
তাঁর অভিনয় কখনও অতিরঞ্জিত নয়, আবার কখনও স্বতঃস্ফূর্ত হাসির উৎস। “সাইলেন্সার লাগানো বিস্কুট”, “খড়কাটা মেশিন”-এর মতো উপমায় উপচে পড়ত তাঁর রসবোধ। পরিচালকদের অনেকেই তাঁকে প্রাসঙ্গিক চরিত্রে ব্যবহার করলেও সত্যজিৎ রায় ছিলেন সেই ব্যতিক্রম, যিনি ছোট চরিত্রকেও শিল্পের ক্যানভাসে পরিণত করতে জানতেন। কামু তেমনই একজন শিল্পী, যিনি পরিচালককে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—নায়ক না হয়েও মঞ্চ আলো করে তোলা যায়।
‘সোনার কেল্লা’-র মন্দার বোস চরিত্র আজও বাঙালির রসনায় উজ্জ্বল। যে সংলাপগুলো সাধারণ দর্শকের মনে গেঁথে গিয়েছে, সেগুলোর পেছনে ছিল কামুর স্বতন্ত্র উচ্চারণ, মুখভঙ্গি আর সাবলীল ভঙ্গিমা। আর সেই চরিত্রের সাহসিকতায় যখন লোহার রড ধরে চলন্ত ট্রেনের এক কামরা থেকে অন্য কামরায় তিনি নিজে ঝুঁকি নিয়ে শট দেন, তখন বোঝা যায়—এই মানুষটি শুধু অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন সাহসীও।
কামুর মধ্যে ছিল স্টান্টম্যানের স্পর্ধা, জাদুকরের হাতসাফাই, শিশুর সরলতা আর অভিনয় শিল্পীর নিখুঁত সময়জ্ঞান। একে তো ছোট চরিত্র, তাও সর্বস্ব দিয়ে ফুটিয়ে তোলা—এটাই ছিল তাঁর নেশা। তাই তো একসময় অভিমান করে সত্যজিৎকে বলেছিলেন, “মানিকদা, চরিত্র না থাকলে একটা দুশ্চরিত্র দিন!”
শুধু পর্দায় নয়, ইউনিটের সদস্যদের জীবনেও তিনি ছিলেন প্রাণ। ট্রেনের বগিতে ‘জাগো বাঙালি’ বলে সকালের চা-ভাঁড়ের বন্দোবস্ত, বা সহ-অভিনেতার নাগরা উঁচু সিলিংয়ে বেঁধে রাখার কাণ্ড—এই সবেই ধরা পড়ে কামুর জীবন্ততা।
তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির পরিসর ছোট হলেও, তার গভীরতা প্রশ্নাতীত। আর সেইজন্যই সত্যজিৎ একাধিকবার বলেছেন, “যে অভিনেতা ছোট চরিত্রেও নিজেকে মনে করিয়ে দেয়, তারই সঙ্গে আমি কাজ করতে ভালবাসি।”
২০০৩ সালে প্রয়াত এই শিল্পীর প্রতি যথার্থ সম্মান এখনও বাকি। তবু বাংলার সিনেমাপ্রেমীরা তাঁকে মনে রাখে সেই একটাই কারণে—তিনি ছিলেন সত্যিকারের অভিনেতা, যিনি নিজের শিল্প দিয়ে চরিত্রকে ‘স্মরণীয়’ করে তোলার কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন।
পাকা আমের স্বাদে অন্য রূপ! রুটির সঙ্গে জমবে এই ঝটপট আমের তরকারি