মল্লিকা সারাভাই
কলকাতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ধ্রুপদী শিল্পের এক অটুট কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত। এখানে নানা ধরনের নৃত্য, সঙ্গীত, এবং নাট্য পরিবেশনার মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতির স্বাদ পুনরুজ্জীবিত হয়। এই শহরের ইতিহাসে এক নতুন সংযোজন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘নৃত্যগাথা’ নামক একটি উত্সব, যা ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও আগ্রহকে আরও গভীর করেছে।
তিন বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে আয়োজিত এই নৃত্য উত্সবে ‘নৃত্যগাথা’ ২০২৪ সালের অনুষ্ঠানটি কলকাতার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে উঠেছে। ভারতীয় বিদ্যাভবন ও জে এল মেহতা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই উৎসব আয়োজন করা হয়, যেখানে মল্লিকা সারাভাই, শোভনা, অরুণা মহান্তির মতো দিকপাল শিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন। তিন দিনের এই মহাযজ্ঞে কোনও প্রবেশমূল্য ছিল না, যা ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যকে আরও ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়েছিল।
‘নৃত্যগাথা’-র প্রথম দিনে ছিল বিশিষ্ট ওড়িশি নৃত্যশিল্পী অরুণা মহান্তির দলবল পরিবেশন। ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ’, ‘ভীমের দুর্যোধন বধ’-এর মতো মহাভারতের বিখ্যাত কাহিনিগুলি ওড়িশি নৃত্যে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছিল। এই পরিবেশনা দর্শকদের মন জয় করেছে। তবে, প্রথম দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবেশনা ছিল মল্লিকা সারাভাইয়ের। তিনি এক অনন্য এবং শক্তিশালী নৃত্য পরিবেশন করেন যা কলকাতার দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে।
মল্লিকার পরিবেশনার নাম ছিল ‘পাস্ট ফরওয়ার্ড’। এটি ছিল চিন্তা-ভাবনার এক অভিনব মিশেল, যেখানে ভারতনাট্যম নৃত্যের বদলানো ফর্ম এবং সমাজে নারীদের অবস্থান ও পরিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে পুরুষের চোখে এবং সমাজের চোখে নারীদের ভূমিকা বদলেছে, ঠিক যেমন ভারতনাট্যমের ধারা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। মল্লিকার পরিবেশনায় ছিল পৌরাণিক কাহিনি যেমন ‘গাল্লি বয়’-এর রাপ গানের ধ্রুপদী সংস্করণও, যা এক অনন্য সঙ্গীত-মুদ্রায় নারীর যন্ত্রণা এবং লাঞ্ছনার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
নৃত্য পরিবেশনার মাঝে তিনি সাহসী কন্ঠে বলেছিলেন, “আমাদের জাগতে হবে।” তিনি মন্তব্য করেন, “এখনও এই সমাজে একজন মেয়ের বড় হয়ে ওঠা ছেলের তুলনায় অনেক আলাদা। আমাদের মায়েরা, নিজেরা মেয়ে হয়েও তাদের ছেলে সন্তানদের যে স্বাধীনতা দিয়ে বড় করেন, মেয়ে সন্তানদের বেলায় তারা খুবই রক্ষনশীল। এটা ভাঙতে হবে। আমাদের উঠে দাঁড়াতে হবে।”
মল্লিকার কলকাতার প্রতি এক বিশেষ প্রেম রয়েছে। তিনি জানান, জীবনের প্রথম পরিবেশনাটি কলকাতায় ছিল। মায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চন্ডালিকা’ নাটকটি পরিবেশন করতে এসেছিলেন ছোট মল্লিকা। তাঁর মা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিষ্যা এবং বাবা ছিলেন এক পণ্ডিত বিজ্ঞানী। মায়ের মতোই রবীন্দ্রনাথই মল্লিকার এক বড় অনুপ্রেরণা। প্রথম গান শেখা তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে, ‘মধু গন্ধে ভরা’ গানটি শিখেছিলেন। এই সব কারণে কলকাতার প্রতি তাঁর এক অদৃশ্য আকর্ষণ রয়েছে এবং তিনি বার বার এই শহরে ফিরে আসেন। পদ্মভূষণ মল্লিকা সারাভাই কলকাতায় এসে আবারও তার শিল্পী মনোভাবের পরিচয় দিলেন।
উৎসবের দ্বিতীয় দিনে শোভনার ভারতনাট্যম পরিবেশন ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। শোভনা শুধু নৃত্যশিল্পী নন, তিনি একজন অভিজ্ঞ অভিনেত্রীও। তাঁর পরিবেশনা দর্শকদের মন ছুঁয়ে গিয়েছে। আর শেষদিনে, শুভজিত দাসের ‘মনসা’ এবং জলসা চন্দ্রের ‘অগ্নি—দ্য বার্ড অফ ফায়ার’ পরিবেশনা ছিল ‘নৃত্যগাথা’ উত্সবের অন্যতম সেরা শিল্পকর্ম।
এই তিন বছরেই ভারতীয় বিদ্যাভবন আয়োজিত ‘নৃত্যগাথা’ কলকাতার সাংস্কৃতিক দৃশ্যে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এই উৎসবের মাধ্যমে ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যকে আরও বড় পরিসরে পৌঁছে দেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে। কলকাতার দর্শকরা বিশেষভাবে এ বছর উৎসবে অংশগ্রহণ করে এক নতুন ধরনের নৃত্য এবং পরিবেশনা উপভোগ করেছেন। ‘নৃত্যগাথা’ আগামী বছর আবারও নতুন চমক নিয়ে ফিরে আসবে, এমনটাই আশা করা হচ্ছে।