ব্যাগের রাজনীতি
সংসদ মানেই রাজনৈতিক আলোচনা, বিতর্ক, এবং দেশগঠনের চর্চা। তবে ২০২৪ সালের শীতকালীন অধিবেশনে রাজনীতির চেয়ে বেশি চর্চিত হয়েছে এক অদ্ভুত বিষয়—ব্যাগ। সাংসদদের স্টাইল স্টেটমেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত ব্যাগ এবার হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
প্রিয়ঙ্কার ব্যাগ এবং রাজনৈতিক বার্তা
কংগ্রেসের নবীন সাংসদ প্রিয়ঙ্কা গান্ধী দুটি আলাদা দিনে দুটি আলাদা বার্তা বহনকারী ব্যাগ নিয়ে সংসদে প্রবেশ করেন। প্রথম দিন তার ব্যাগে লেখা ছিল ‘প্যালেস্তাইন’, যা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির প্রতীক। পরের দিন তার ব্যাগে ছিল ‘বাংলাদেশ’, যা বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের বিষয়টি উত্থাপন করে।
তবে প্রিয়ঙ্কার এই রাজনৈতিক বার্তাবাহী ব্যাগ পাল্টা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। বিজেপির সাংসদ অপরাজিতা সারেঙ্গি প্রিয়ঙ্কাকে উপহার হিসেবে একটি ব্যাগ দেন, যেখানে লেখা ছিল ‘১৯৮৪’। এটি সেই বছরের শিখ-বিরোধী দাঙ্গার প্রতি ইঙ্গিত করে, যা কংগ্রেসের ইতিহাসের একটি বিতর্কিত অধ্যায়।
ব্যাগবতীদের ফ্যাশনের প্রদর্শনী
সংসদে ব্যাগের ব্যবহার নতুন নয়। অতীতেও সাংসদেরা নথিপত্র নিয়ে ব্যাগ ব্যবহার করতেন। তবে বর্তমানে এটি শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিস বহনের উপায় নয়, বরং সাংসদের ফ্যাশন এবং রাজনৈতিক বার্তা প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র একসময় তার লুই ভিতোঁ ব্র্যান্ডের ব্যাগের জন্য আলোচিত হয়েছিলেন। তার ব্যাগ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য হলেও তিনি সংসদে ‘ব্যাগবতী’ খেতাবের অধিকারিণী হয়ে ওঠেন।
এবারের অধিবেশনে মহুয়াকে ছাপিয়ে গেছেন আম আদমি পার্টির সাংসদ স্বাতী মালিওয়াল। তিনি মার্কিন ব্র্যান্ড কোচ-এর একটি সাদা হোবো ব্যাগ নিয়ে সংসদে হাজির হন। পরনে ছিল নীল শাড়ি এবং সাদা ফুলহাতা জ্যাকেট। অন্যদিকে, অভিনেত্রী থেকে সাংসদ হওয়া কঙ্গনা রানাউত বহন করেছেন লুই ভিতোঁর স্যাচেল ব্যাগ।
তৃণমূলের সায়নী ঘোষ তার মেসেঞ্জার ব্যাগের জন্য পরিচিত। সমাজবাদী পার্টির সাংসদ ডিম্পল যাদব ব্যবহার করেন বোটেগা ব্র্যান্ডের টোট ব্যাগ। এছাড়া, তৃণমূল সাংসদ শতাব্দী রায় এবং বিজেপির হেমা মালিনী তাদের শৌখিন স্লিং ব্যাগ নিয়ে চর্চায় থাকেন।
ব্যাগবতী হওয়ার কারণ কী?
কেন ব্যাগ এখন রাজনীতির আলোচনার বিষয়? প্রবীণ সাংসদদের মতে, এর পিছনে রয়েছে সমাজমাধ্যম এবং ক্যামেরার প্রতি সাংসদের মনোযোগ। সংসদে ভাষণ দেওয়ার চেয়ে সমাজমাধ্যমে নিজের ছবি বা বার্তা প্রচার করা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রবীণ এক সাংসদ বলেন, “পহলে দর্শনধারী, পিছে গুণবিচারী।” অর্থাৎ, বাহ্যিক প্রকাশ এখন মানুষের কাছে বেশি প্রাসঙ্গিক। ফ্যাশন এবং বিত্তের প্রদর্শনী দিয়ে মানুষকে আকর্ষণ করা অনেক সহজ।
বিত্ত এবং রাজনীতি
একটি বড় পরিবর্তন এসেছে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মনোভাবেও। অতীতে অনেক বিত্তশালী সাংসদ তাদের বিলাসিতা আড়াল করতেন। এখন তা প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয়। কারণ, মানুষের মনস্তত্ত্ব বদলেছে। বিত্তের প্রদর্শনী এখন সম্মানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাগের মধ্যে রাজনীতি এবং ফ্যাশন
সাংসদদের ব্যাগে শুধু নথিপত্র নয়, বরং তাদের রাজনীতি এবং ফ্যাশনের প্রকাশ ঘটছে। কংগ্রেস, বিজেপি বা তৃণমূল—সব দলের সাংসদদের মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
যদিও অনেকে এই প্রদর্শনী নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিজেপির বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল, যিনি পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার, বলেন, “স্টাইল স্টেটমেন্ট থাকতে পারে। তবে জনপ্রতিনিধি হয়ে এ সবের জন্য সময় পাওয়া যায় কীভাবে?”
শেষ কথা
সংসদের অধিবেশনে ব্যাগ এখন শুধু প্রয়োজন নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিবৃতি। ফ্যাশন, বিত্ত এবং রাজনৈতিক বার্তা—সবই মিশে যাচ্ছে এই ব্যাগে। তবে এই প্রবণতা রাজনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে।