বোয়াল থেকে ল্যাটা!
বাংলার ঘরবাড়িতে দুর্গাপুজো মানেই শুধু দেবীর আরাধনা নয়, তা সঙ্গে থাকে বর্ণিল ভোগের আয়োজন। পোলাও, খিচুড়ি, নিরামিষ তরকারি তো থাকেই, কিন্তু বহু বাড়িতেই ভোগের থালায় রঙিন মাছের পদও জায়গা পায়। ইলিশ, বোয়াল, রুই থেকে শুরু করে ল্যাটা, চিংড়ি, লাউ চিংড়ি—মায়ের ভোগের তালিকা বৈচিত্র্যময়।
দুর্গাপুজোর কয়েক দিন আগে থেকে শুরু হয় বাড়ির প্রস্তুতি। চাল, ডাল, ময়দা, চিনিসহ সমস্ত জিনিস ঠিকঠাক আছে কি না তা খুঁটিয়ে দেখা হয়। অসময়ের বৃষ্টি বা বাতাসের ছাপ যেন না পড়ে, সে দিকে খেয়াল রাখতে হয়। সারাবছর অপেক্ষা করা এই কয়েক দিনের জন্যই।
শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোতে ভোগের তালিকাও বিশাল। সেখানে টাটকা মিষ্টি রান্নার জন্য মেদিনীপুর থেকে চোদ্দজন শিল্পী আসে। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত নানা মিষ্টি তৈরি হয়—পক্কান, কটকটি, ঘন শোনপাপড়ি, ক্ষীর তক্তি, লবঙ্গ লতিকা, মগের নাড়ু, তিলের নাড়ু, পূর্ণ চন্দ্রপুলি, খুরমা, সোহাগিনী—তাদের অর্ধেক নামও শুনলে মুখে জল আসে। বর্তমানে শিল্পীর অভাবে সব মিষ্টি না থাকলেও এখনও ভোগে থাকে দশ-বারো রকমের মিষ্টি, মোতিচুর, জিলিপি।
ভোগের মধ্যে মাছের রাজত্বও কম নয়। কাশীমবাজার রাজবাড়ির নবমীতে ইলিশ ভোগের পাশাপাশি বোয়াল মাছ, চিংড়ি, লাউ চিংড়ির ঝাল চচ্চড়ি দেওয়া হয়। আলু, ফুলকপি, রুই মাছ দিয়ে তৈরি এই পদ মা দুর্গার ভোগের অপরিহার্য অংশ। কিছু বাড়িতে সন্ধিপুজোর ভোগে ল্যাটা মাছ, পোনা মাছের কালিয়া থাকে। এছাড়া গ্রাম বাংলার কিছু বাড়িতে বক ফুল ভাজা বা পাঁঠার মাংসও পরিবেশন করা হয়।
সপ্তমীতে সাধারণত সাত মণ ভাত, খিচুড়ি, পাঁচ রকমের ভাজা, মাছ, অম্বল, পায়েস থাকে। অষ্টমীতে নিরামিষের তরকারি, আলু-পটলের ডালনা, ধোকার ডালনা রাখা হয়। নবমীতে নানা মাছ, ঝাল চচ্চড়ি, লাউ চিংড়ি আর মিষ্টির মেলা—এভাবেই সমাপ্ত হয় দুর্গাপুজোর ভোগ।
দুর্গাপুজোর ভোগ শুধু রান্না নয়, বরং বাংলার সংস্কৃতিকে বারবার বুনে দেওয়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম। কলকাতার বনেদি দাসবাড়ি বা মিত্রবাড়ি থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার রাজবাড়ি সব জায়গায় নানা রকম মাছ, মিষ্টি, ভাজা আর নিরামিষ পদ দিয়ে ভোগ সাজানো হয়। প্রতিটি থালা, প্রতিটি পদ যেন মা দুর্গার প্রতি ভক্তির আর বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক।
দুর্গাপুজোর ভোগ তাই শুধু খাওয়ার আয়োজন নয়, তা এক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন, যেখানে প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, পরিবারের যত্ন আর রাঁধনীর মেধা মিশে এক অনন্য উৎসব সৃষ্টি করে।
অল্পেই প্রাচুর্য: নিজস্ব নিয়মে ত্বকচর্চায় আগ্রহী বিবৃতি চট্টোপাধ্যায়