ফিট থেকেও বল হাতে অনুপস্থিত স্টোকস!
অ্যাশেজ সিরিজ় মানেই চাপ, উত্তেজনা আর কঠিন সিদ্ধান্তের লড়াই। সেই লড়াইয়ের মধ্যেই অ্যাডিলেড টেস্টের তৃতীয় দিনে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখল ক্রিকেটবিশ্ব। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক বেন স্টোকস সম্পূর্ণ ফিট থাকা সত্ত্বেও বল করলেন না। চোট নেই, চিকিৎসকদের তরফে কোনও নিষেধাজ্ঞাও ছিল না। তবু দিনের গোটা খেলায় তাঁকে বল হাতে দেখা গেল না। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে অবিলম্বে। পরে সেই রহস্যের কিছুটা পর্দা সরালেন ইংল্যান্ডের সহকারী কোচ জিতেন পটেল।
স্টোকসের না-বোলিং ইংল্যান্ডের জন্য যে কতটা ক্ষতিকর হয়েছে, তা মাঠের পরিস্থিতিতেই স্পষ্ট। অস্ট্রেলিয়া দ্রুত রানের পথে এগিয়ে যায়। দলের অন্যতম প্রধান অলরাউন্ডার ও অধিনায়ক মাঠে থাকলেও তাঁর বোলিংয়ের অভাব ইংল্যান্ডের আক্রমণকে ভোঁতা করে দেয়। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, হয়তো চোটের ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু ম্যাচ শেষে সহকারী কোচ জানালেন, বিষয়টি শারীরিক নয়, পুরোপুরি মানসিক।
ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে স্টোকস ছিলেন একমাত্র ভরসা। দল যখন একের পর এক উইকেট হারাচ্ছিল, তখন তিনি লড়াই চালিয়ে যান। প্রায় চার ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ক্রিজে থেকে ১৯৮ বল মোকাবিলা করে ৮৩ রান করেন। এই ইনিংসটি শুধু রান নয়, মানসিক শক্তিরও পরিচয়। কিন্তু তৃতীয় দিনের সকালে মিচেল স্টার্কের একটি ভিতরের দিকে ঢুকে আসা দুরন্ত বলে বোল্ড হয়ে যান স্টোকস। আউট হওয়ার মুহূর্তে তাঁর শরীরী ভাষা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, কতটা ভেঙে পড়েছেন তিনি।
সহকারী কোচ জিতেন পটেলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ওই আউটটাই স্টোকসের মানসিক অবস্থাকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করে। তিনি জানান, স্টোকস ব্যাট হাতে এত ভাল লড়াই করছিলেন যে, এমন ভাবে আউট হওয়া মেনে নিতে পারেননি। তার উপর দীর্ঘ ইনিংস খেলার ফলে শরীরেও যথেষ্ট ধকল গিয়েছে। সব মিলিয়ে অধিনায়ক মনে করেন, ওই অবস্থায় বল করলে তিনি নিজের সেরা দিতে পারবেন না।
জিতেন পটেল বলেন, স্টোকস এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি মাঠে নামলে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে খেলেন। কিন্তু ওই সময় তাঁর পক্ষে শতভাগ দেওয়াটা সম্ভব ছিল না। হয়তো ৭০ বা ৮০ শতাংশ দিতে পারতেন, কিন্তু সেটাই তাঁর মানসিকতায় যথেষ্ট নয়। ঝুঁকি নিয়ে খেললে চোটের আশঙ্কা বা দলের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। তাই অধিনায়ক নিজেই সিদ্ধান্ত নেন, এই মুহূর্তে বল না করাই শ্রেয়।
এই সিদ্ধান্ত যে বিতর্ক তৈরি করবে, তা আন্দাজ করাই যায়। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে অধিনায়কের মানসিক দৃঢ়তা এবং মাঠে উপস্থিতি দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রাক্তন ক্রিকেটারের মতে, এমন সময়েই নেতার দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। আবার কেউ কেউ বলছেন, দীর্ঘ সিরিজ়ে একজন অলরাউন্ডারকে বাঁচিয়ে রাখাও সমান জরুরি।
ম্যাচের দিকে তাকালে ইংল্যান্ডের অবস্থা যে খুব একটা স্বস্তির নয়, তা বলাই বাহুল্য। অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে ৩৭১ রান করে। জবাবে ইংল্যান্ড থামে ২৮৬ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া দ্রুত লিড বাড়িয়ে নেয় এবং তৃতীয় দিন শেষে চার উইকেট হারিয়ে ২৭১ রান তোলে। তখনই তারা ৩৫০-র বেশি রানে এগিয়ে যায়। এখনও দু’দিন খেলা বাকি থাকলেও পরিস্থিতি ইংল্যান্ডের পক্ষে কঠিন।
এই টেস্ট হারলে অ্যাশেজ সিরিজ়ও হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সেই ক্ষেত্রে অধিনায়ক স্টোকসের সিদ্ধান্ত ও মানসিক অবস্থান আরও বেশি করে আলোচনায় আসবে। প্রশ্ন উঠবে— চাপের মুহূর্তে নেতৃত্বের মানে কী, আর কখন নিজের শরীর ও মনকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত? অ্যাডিলেড টেস্ট হয়তো সেই প্রশ্নগুলিরই নতুন অধ্যায় লিখে দিল।