প্যাডেলে পা রেখে দিঘা থেকে দার্জিলিং
সূর্যোদয়ের আগেই বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের সাক্ষী রেখে ৩৭ জন সাইক্লিস্ট যাত্রা শুরু করেছেন দিঘার মেরিন ড্রাইভ থেকে। তাঁদের গন্তব্য হিমালয়ের কোলে দার্জিলিংয়ের ঘুম স্টেশন। ৮৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ তাঁরা অতিক্রম করবেন, ছুঁয়ে যাবেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও আকর্ষণীয় স্থান।
আজ, শনিবার ভোর ৫টায় শুরু হয়েছে এই চ্যালেঞ্জিং সাইকেল প্রতিযোগিতা— ‘কোস্ট টু ক্রেস্ট’। আয়োজকদের মতে, এটি পূর্ব ভারতের একমাত্র আল্ট্রা সাইকেল প্রতিযোগিতা। আল্ট্রা সাইক্লিং বলতে সাধারণত ২০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করতে হয়। ২০২৩ সালে প্রথমবার আয়োজিত হওয়ার পরে, এটি এবার দ্বিতীয় বর্ষে পা দিয়েছে।
প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাইক্লিস্টরা ইতিমধ্যেই দিঘায় উপস্থিত হয়েছেন। তাঁদের জন্য এই প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা। সমতল থেকে পাহাড়— বাংলার বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক অবস্থান এই যাত্রায় প্রতিযোগীদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে।
যাত্রাপথের বিবরণ
দিঘার মেরিন ড্রাইভ থেকে যাত্রা শুরু করে প্রতিযোগীরা ছুঁয়ে যাবেন কোলাঘাট, ডানকুনি, মগরাহাট, নবদ্বীপ, কৃষ্ণনগর, বহরমপুর, ফরাক্কা, ডালখোলা, শিলিগুড়ি এবং হিল কার্ট রোড। যাত্রার শেষের ৮০ কিলোমিটার পথ পাহাড়ি রাস্তায় আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠবে। তবে এটাই অনেকের কাছে এই রেসের মূল আকর্ষণ।
পুনে থেকে আসা অমিত সমর্থ এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছেন। অমিত বলেন, “বাংলার প্রকৃতি এবং পাহাড়ি পথে সাইকেল চালানোর আনন্দই আমাকে বারবার এখানে টেনে আনে।’’ তিনি গত বছরের ‘কোস্ট টু ক্রেস্ট’ প্রতিযোগিতার বিজয়ী ছিলেন, ৪০ ঘণ্টায় পুরো পথ অতিক্রম করেছিলেন।
৭০ বছর বয়সী মহিন্দর সিংহ ভারজ, যিনি এই প্রতিযোগিতার প্রবীণতম অংশগ্রহণকারী, বলেন, “আমি ৫৫ বছর বয়সে সাইকেল চালানো শুরু করেছি। বয়স কোনও বাধা নয়; নিয়মিত অনুশীলনই আসল।” কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত সাইকেল প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মহিন্দর বাংলার প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং সুযোগ
এই প্রতিযোগিতা ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা সাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশন দ্বারা অনুমোদিত। প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছালে ‘রেস অ্যাক্রস আমেরিকা’ (RAAM)-এ যোগদানের ছাড়পত্র পাওয়া যাবে। RAAM হলো প্রায় ৪৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি আন্তর্জাতিক সাইক্লিং রেস, যা আমেরিকার পশ্চিম উপকূল থেকে পূর্ব উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত।
আয়োজকদের অন্যতম অভিষেক তুঙ্গা বলেন, “বিদেশি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ অনেকের পক্ষে ব্যয়বহুল। তাই পূর্ব ভারতের সাইক্লিস্টদের জন্য এই ধরনের প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে। এটি বাংলার প্রকৃতি ও ইতিহাসকে জানারও একটি সুযোগ।”
এবার প্রতিযোগীরা ৪৯ ঘণ্টার মধ্যে ঘুম স্টেশনে পৌঁছালে RAAM-এ যোগদানের যোগ্যতা অর্জন করবেন। আর রেস সম্পন্ন করার শংসাপত্র পেতে হলে ৫৯ ঘণ্টার মধ্যে, অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর বিকেল ৪টার মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে।
বর্ষশেষের উৎসব
দু’-আড়াই দিনের পরিশ্রম শেষে প্রতিযোগীদের জন্য অপেক্ষা করবে বর্ষশেষের দার্জিলিং। ৩১ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক ‘ক্যাফে গ্লেনারিজ’-এ হবে তাঁদের আনন্দ উদযাপন।
এই প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র একটি ক্রীড়া ইভেন্ট নয়; এটি শারীরিক দক্ষতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ‘কোস্ট টু ক্রেস্ট’ পূর্ব ভারতের সাইক্লিস্টদের কাছে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।