পাঁচতারা থেকে পাড়ার ক্লাব
নতুন বছর মানেই উদযাপন। আলোর চাঁদোয়া এবং বর্ণিল সাজে সেজে ওঠা পার্ক স্ট্রিট যেন কলকাতার কার্নিভাল। কিন্তু নতুন বছরের এই উদযাপন কি একঘেয়ে হয়ে গিয়েছে? থার্টি ফার্স্ট নাইট থেকে পয়লা জানুয়ারির উদযাপন কি সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে, নাকি এর মধ্যে এখনও রয়ে গেছে পুরনো কলকাতার সেই আমোদপ্রবণ ধারা?
পাড়ার ক্লাবের হালচাল
কলকাতার উপকণ্ঠ বা মফস্সল—সব জায়গায়ই ইংরেজি নববর্ষের রাতটি যেন একই রকম। পাড়ার ক্লাবে সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয় তোড়জোড়। ডিজে বক্সের সুরে মাতোয়ারা পরিবেশ। বাঁশের খুঁটিতে ঝুলছে বেলুন, রঙিন কাগজের শিকল। ক্লাবঘরের সামনে মহা হান্ডায় মটন ফুটছে, আর বড়দের জন্য অপেক্ষা করছে বিশেষ পানীয়ের বোতল। রাত বাড়তেই সুরার আসর, নাচগান এবং উলটি গিনতি—সব মিলিয়ে এক জমজমাট উৎসব।
এই চিত্র শুধু কলকাতায় নয়, মফস্সল থেকে গ্রাম পর্যন্ত একই রকম। বাঙালির নববর্ষের উদযাপন যেখানে পাঞ্জাবি পরে রসমালাই খাওয়া, সেখানে ইংরেজি নববর্ষের ফুর্তি যেন আরও বেশি উচ্ছ্বাসময়।
সাহেবি কলকাতার স্মৃতি
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময়েও সাহেবপাড়ায় বড়দিন এবং নিউ ইয়ার উদযাপনের ধুম ছিল। সেকালের জাঁদরেল হোটেল উইলসনে সপ্তাহব্যাপী উৎসবের আয়োজন হত। ব্র্যান্ডি আর বিলেতি পানীয়ের ফোয়ারা চলত রাতভর। সাহেবদের সেই উদযাপন সম্পর্কে দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় জানা যায়, লন্ডনি কেতায় সেজে, নতুন জামাকাপড় পরে হাভাতে সাহেবরাও এই উৎসবে শামিল হতেন।
কিন্তু সেসময়ে হুতোম প্যাঁচার মতো রসিক নকশাকাররাও সাহেবি উৎসবের কথা উল্লেখ করতে চাননি। বাঙালির হালখাতার নববর্ষ এবং সাহেবদের ইংরেজি নববর্ষের মধ্যে ছিল বিশাল ফারাক।
পঞ্চাশ থেকে আশি দশক: উদযাপনের বিবর্তন
পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে নিউ ইয়ার উদযাপন মূলত অভিজাত ক্লাব এবং অফিসার্স ক্লাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সত্তরের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে কলকাতার ফুর্তির পরিবেশে ছিল এক ধরনের স্থবিরতা। তবে আশির দশকে এই উদযাপন নতুন রূপে ফিরে আসে।
গ্র্যান্ড হোটেলের বলরুমে সালসা নাচ এবং বিদেশি নর্তকীদের পারফরম্যান্স সেই সময়ের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। তবে অতিরিক্ত মাতলামি এবং গোলমালের কারণে বলরুমের উদযাপন এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। ফুর্তি সীমাবদ্ধ হয় রেস্তোরাঁ এবং পানশালায়।
মধ্যবিত্তের টেলিভিশন নির্ভর উদযাপন
আশির দশকের শেষ এবং নব্বইয়ের গোড়ার দিকে দূরদর্শনের বিশেষ অনুষ্ঠানে মধ্যবিত্ত বাঙালি নতুন বছরের আনন্দ খুঁজে পেত। বলিউডি গান এবং স্ট্যান্ড-আপ কমেডির সঙ্গে থাকত মধ্যরাতের কাউন্টডাউন। ১২টা বাজলেই “হ্যাপি নিউ ইয়ার” বলে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হত। এই সরল আনন্দ মধ্যবিত্তের ঘরোয়া উদযাপনের অংশ হয়ে উঠেছিল।
বর্তমানের নিউ ইয়ার: উচ্ছ্বাসে ভাটা?
সময়ের সঙ্গে কলকাতার নিউ ইয়ার উদযাপন অনেকটাই বদলে গেছে। পাঁচতারা হোটেল থেকে পাড়ার ক্লাব—সব জায়গায়ই ফুর্তি চলছে, কিন্তু সেই আগের জাঁকজমকের সঙ্গে যেন কিছুটা ভাটা পড়েছে।
আজকের নিউ ইয়ার উদযাপন অনেক বেশি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। পার্ক স্ট্রিট এখনও কলকাতার কার্নিভালের কেন্দ্র, তবে শহরের অন্যান্য অংশে উদযাপনের চিত্র আরও সাধারণ হয়ে গেছে। নাইট ক্লাব এবং ব্যক্তিগত পার্টি এখন উদযাপনের প্রধান ক্ষেত্র।
উপসংহার
পাঁচতারা হোটেলের জাঁকজমক থেকে পাড়ার ক্লাবের জমজমাট ডিজে—নতুন বছরের উৎসব কলকাতার সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে উদযাপনের ধরন পাল্টেছে। সাহেবি কলকাতা থেকে মধ্যবিত্তের দূরদর্শন নির্ভর আনন্দ, আর এখনকার নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ফুর্তি—সবই মিশে আছে শহরের ইতিহাসে। কলকাতার নিউ ইয়ার উদযাপন এখনও বহুমাত্রিক, কিন্তু সেই পুরনো মোচ্ছবের উন্মাদনা হয়তো এখন আর নেই।