নিয়ানডারথালদের উত্তরাধিকার
হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের শরীরে বয়ে চলেছে পূর্বপুরুষদের জিন। সেই জিনের মধ্যে কিছু উপকারী, আবার কিছু রয়েছে যেগুলি আধুনিক মানুষের নানা রোগের কারণ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানালেন, এমনই একটি মারাত্মক মস্তিষ্কজনিত রোগের সূত্র মিলেছে নিয়ানডারথালদের জিনে!
প্রায় দুই থেকে তিন লক্ষ বছর আগে মধ্যপ্রস্তর যুগে পৃথিবীতে একসঙ্গে বিচরণ করত হোমো স্যাপিয়েন্স (আধুনিক মানুষ) এবং নিয়ানডারথালরা। গবেষকরা বহু আগেই জানতে পেরেছিলেন, এই দুই প্রজাতির মধ্যে সম্পর্ক হয়েছিল এবং তার ফলে প্রাচীন জিন আধুনিক মানুষের শরীরে রয়ে গিয়েছে। তবে এত দিন সেটি ছিল অনুমানের পর্যায়ে। এবার ফিলিপিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কিম্বারলি প্লম্পের নেতৃত্বে একটি দল সরাসরি প্রমাণ পেয়েছেন, নিয়ানডারথালদের জিন থেকেই এসেছে মস্তিষ্কের একটি গুরুতর রোগ—চিয়ারি ম্যালফর্মেশন।
চিয়ারি ম্যালফর্মেশন এমন এক সমস্যা, যেখানে মস্তিষ্কের নীচের অংশ অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে মেরুদণ্ড পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মাথা ও ঘাড়ে ব্যথা, ভারসাম্য হারানোসহ নানা জটিল উপসর্গ দেখা দেয়। বিশ্বে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে একজন এই রোগে আক্রান্ত। গবেষকরা ১০৩টি খুলি পরীক্ষা করে দেখেছেন—এর মধ্যে নিয়ানডারথালদের খুলি এবং চিয়ারি আক্রান্ত মানুষের খুলির গঠন প্রায় এক। অন্য কোনও প্রাচীন মানবপ্রজাতির সঙ্গে এমন মিল পাওয়া যায়নি।
২০১৩ সালে এই রোগের সঙ্গে প্রাচীন জিনের যোগ থাকার কথা প্রথম উঠেছিল। এবার তা আরও পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হল। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হোমো ইরেকটাস এবং হোমো হেইডেলবারজেনসিসের খুলির গঠন সুস্থ মানুষের মাথার গঠনের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি মেলে। কিন্তু নিয়ানডারথালদের খুলির বিশেষ অংশের গঠন একমাত্র চিয়ারি রোগীদের সঙ্গে মিলে যায়।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এই রোগের প্রকোপের সঙ্গে নিয়ানডারথাল ডিএনএর অনুপাতের সম্পর্ক আছে কি না। গবেষকরা জানাচ্ছেন, আফ্রিকার মানুষের শরীরে নিয়ানডারথালদের ডিএনএ প্রায় নেই বললেই চলে। তুলনায় ইউরোপ এবং এশিয়ার মানুষের মধ্যে তা বেশি। ফলে এই অঞ্চলে চিয়ারি ম্যালফর্মেশনের প্রবণতা বেশি কিনা, সেটিও গবেষণার বিষয়।
এই নতুন তথ্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কারণ রোগের মূল উৎস জানা থাকলে, তার প্রতিকারও সহজ হতে পারে। অনেকেই আশাবাদী, ভবিষ্যতে এই রোগের নিরাময় বা নির্মূল সম্ভব হবে। যদিও গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবু বিজ্ঞানীদের মতে এই আবিষ্কার চিয়ারি ম্যালফর্মেশন রোগ সম্পর্কে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে এবং আগামী দিনে চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
মানুষের শরীরে গোপনে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন মানবপ্রজাতির ছায়া যে এখনও আমাদের জীবনের নানা রহস্যের জবাব দিচ্ছে, এই গবেষণা তার আরেকটি প্রমাণ।