দোলযাত্রা থেকে হোলি!
একসময়ের আন্তরিক, আবেগঘন সামাজিক উৎসব দোলযাত্রা আজ যেন রূপ নিয়েছে উত্তর ভারতের ব্যক্তিগত হোলির হুল্লোড়ে। কেন বাঙালি এমন বিজাতীয় সংস্কৃতি আপন করে নিল? কোথায় হারিয়ে গেল আমাদের কৃষ্টি, ঐতিহ্য, আবেগ?
শেকড়ের সন্ধানে: দোলযাত্রার প্রকৃত উৎস
দোলযাত্রা বাংলার বৈষ্ণব ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কৃষ্ণ ও রাধার প্রেমকথার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই উৎসব মূলত রঙের খেলা, ভক্তি ও আনন্দের সমাহার। চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মও দোলপূর্ণিমার দিনে হওয়ায় এই উৎসব হয়ে ওঠে বাংলার আত্মার উৎসব। গৃহদেবতার আরাধনা, সংকীর্তন, আবির খেলা এবং প্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে দোলযাত্রা ছিল এক সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক।
শহর কলকাতা ও দোলযাত্রার বিবর্তন
হুতোম প্যাঁচার নকশায় দেখা যায়, একসময় কলকাতার বাবুরা দোলের দিন মদ, মাংস ও বাইজির নাচগানের আসর বসাতেন। যদিও গ্রামবাংলার দোল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন – সেখানে ছিল গৃহদেবতার দোলযাত্রা, শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা ও কীর্তনের সুর।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্য বদলে গেল। আজকের দিনে কলকাতায় দোল মানেই মদের দোকানের সামনে লম্বা লাইন, ডিজে বাজিয়ে অরাজক নাচগান, এবং রঙের নামে অযথা বিশৃঙ্খলা। সামাজিক সম্প্রীতির এই উৎসব আজ যেন ব্যক্তিগত আমোদ-প্রমোদের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
বাঙালির উৎসব কি হারিয়ে যাচ্ছে?
বাংলার দোলযাত্রা যেখানে শ্রীকৃষ্ণ ও চৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তিরসের উৎসব ছিল, সেখানে এখন এর মধ্যে হোলির রঙিন উন্মাদনা ঢুকে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এবার নবদ্বীপে তিন দিন মাছ-মাংসের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ এসেছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির মধ্যে এক অন্য সংস্কৃতির প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
হোলির ইতিহাস ও বাঙালির অবস্থান
উত্তর ভারতে হোলি মানেই হোলিকা দহন, রঙের মাতামাতি, আবির, গুলাল এবং গানবাজনার উন্মাদনা। মোগল দরবারেও হোলি পালনের প্রচলন ছিল। আকবর, শাহজাহানরা দরবারে গোলাপজল ও আবির ছড়িয়ে হোলি খেলতেন। এমনকি আজও বৃন্দাবনের বাঁকেবিহারী মন্দিরের কৃষ্ণের পোশাক তৈরি করেন মুসলিম কারিগররা।
গ্রামবাংলার হারানো ঐতিহ্য
এককালে বাংলার গ্রামগুলিতে দোল মানে ছিল গৃহদেবতার আরাধনা, কীর্তন, আবির খেলা ও মহাভোগ বিতরণ। শোভাযাত্রা, সিংহাসনে শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি বসিয়ে গঙ্গাজল ছিটিয়ে নগর পরিক্রমা, দোলমঞ্চে প্রতিমা স্থাপন করে রাতভর সংকীর্তন – এসবই ছিল বাংলার দোলের অনন্য বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু এখন শহরের মতো গ্রামেও হোলির প্রভাব স্পষ্ট। হিন্দি গান, উগ্র নাচগান, এবং বিজাতীয় সংস্কৃতির দাপট বাংলার দোলযাত্রার অন্তরকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে।
ফিরিয়ে আনা হোক বাঙালির নিজস্ব দোল
বাঙালির উচিত তার নিজস্ব সংস্কৃতির শেকড়কে আঁকড়ে ধরা। আমাদের দোলযাত্রা শুধু রঙের খেলা নয়, এটি প্রেম, ভক্তি ও আনন্দের এক নিখাদ রূপ। আজ সময় এসেছে আবার শ্রীকৃষ্ণ ও চৈতন্যের দোল উৎসবকে পুনরুজ্জীবিত করার। ফিরে আসুক সেই আন্তরিকতা, সেই কীর্তনের সুর, সেই মন্দির প্রাঙ্গণের পূণ্য আবহ।
আমাদের ঐতিহ্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই। দোলযাত্রা যেন বাঙালির অন্তরের উৎসব হয়ে থাকে, অযথা হুল্লোড়ের নয়।