দেবযানী-কাণ্ড থেকে ওমান উপসাগর!
ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ইতিহাসে ২০১৩ সালের ‘দেবযানী খোবরাগাড়ে-কাণ্ড’ অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়। নিউ ইয়র্কে কর্মরত ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানীর গ্রেফতারি এবং তাঁর সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের আচরণ সে সময় দুই দেশের মধ্যে নজিরবিহীন কূটনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল। ২০২৬ সালে ওমান উপসাগরে মার্কিন সামরিক অভিযানে তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর পর সেই পুরনো ঘটনার স্মৃতি আবারও সামনে চলে এসেছে।
কূটনৈতিক বিরোধের সূত্রপাত
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে নিউ ইয়র্কে ভারতের ডেপুটি কনসাল জেনারেল হিসেবে কর্মরত দেবযানী খোবরাগাড়েকে গৃহকর্মীর ভিসা সংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার করে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ ছিল, তিনি তাঁর গৃহকর্মীর বেতন ও কর্মপরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন।
তবে বিতর্কের মূল কারণ ছিল গ্রেফতারির পদ্ধতি। দেবযানীকে তাঁর মেয়ের স্কুলের বাইরে আটক করা হয়, হাতকড়া পরানো হয় এবং পরে তাঁকে স্ট্রিপ সার্চের মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি সাধারণ অপরাধীদের সঙ্গে একই আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছিল তাঁকে। এই আচরণ ভারতজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
দিল্লির পাল্টা পদক্ষেপ
ঘটনার পর নয়াদিল্লি দ্রুত এবং কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন মার্কিন আচরণকে ‘ঘৃণ্য’ ও ‘বর্বরোচিত’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
ভারত সরকার একাধিক কূটনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়। মার্কিন কূটনীতিকদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা কমানো হয়, বিভিন্ন শহরে তাদের পরিচয়পত্র পুনর্বিবেচনা করা হয় এবং নয়াদিল্লিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা ব্যারিকেড পর্যন্ত সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে মার্কিন কূটনীতিক ওয়েন মে-কে দেশ ছাড়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
এই ঘটনাকে অনেকেই ভারতের তরফে জাতীয় মর্যাদা রক্ষার এক দৃঢ় বার্তা হিসেবে দেখেছিলেন।
২০২৬ সালে নতুন বিতর্ক
সম্প্রতি ওমান উপসাগরে মার্কিন সামরিক অভিযানে তিন ভারতীয় নাবিক— আদিত্য শর্মা, শিবানন্দ চৌরাসিয়া এবং পাটনালা সুরেশ— নিহত হওয়ার ঘটনায় ভারতে নতুন করে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রক মার্কিন ‘চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স’ জেসন মিকস-কে তলব করে। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সরাসরি মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিয়ো-র সঙ্গে কথা বলে ভারতের প্রতিবাদ জানান।
তবে মার্কিন প্রতিক্রিয়ায় নিহত ভারতীয় নাবিকদের প্রসঙ্গ বা ভারতের উদ্বেগের উল্লেখ না থাকায় সমালোচনা আরও বেড়েছে।
কেন ফের আলোচনায় ২০১৩?
সমালোচকদের প্রশ্ন, ২০১৩ সালে একজন ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনায় ভারত যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল, ২০২৬ সালে ভারতীয় নাগরিকদের মৃত্যুর পর সেই একই ধরনের কূটনৈতিক দৃঢ়তা কি দেখা যাচ্ছে?
এই প্রসঙ্গে কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর মার্কিন অবস্থানকে ‘অত্যন্ত মর্মান্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে প্রাক্তন বিদেশসচিব নিরুপমা রাও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে কৌশলগত স্বার্থ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ অনেক সময় কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
মূল প্রশ্ন
২০১৩ সালে দেবযানী-কাণ্ডে ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক মহলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল যে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে দিল্লি আপস করবে না। ১৩ বছর পরে, ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুর ঘটনায় আবারও সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে— আধুনিক ভূরাজনীতির জটিল বাস্তবতায় শুধুমাত্র কূটনৈতিক প্রতিবাদ কতটা কার্যকর, আর জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে একটি রাষ্ট্র?
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?