কে এই বাগেশ্বর বাবা ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী?
দুর্গাপুজোর আগে পশ্চিমবঙ্গে আমিষ-নিরামিষ খাবার নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন মধ্যপ্রদেশের বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। হাওড়ার লিলুয়ার এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এসে দুর্গাপুজোর মণ্ডপের আশপাশে আমিষ খাবার বিক্রি বন্ধ করার আবেদন জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই মন্তব্যের পরই রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে তাঁকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু কে এই ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী, যাঁকে অনেকে ‘বাগেশ্বর বাবা’ নামেও চেনেন?
৩০ বছরেই বিপুল জনপ্রিয়তা
ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর জন্ম ১৯৯৬ সালের ৪ জুলাই মধ্যপ্রদেশে। জন্মের সময় তাঁর নাম ছিল ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ গর্গ। পরে তিনি ‘ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী’ নাম গ্রহণ করেন। তাঁর বাবা রামকৃপাল গর্গ পেশায় পুরোহিত ছিলেন এবং দাদু ভগবানদাস গর্গও সাধুজীবন যাপন করতেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর জেলার বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে অবস্থিত বাগেশ্বর ধামই তাঁর কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র। প্রতি বছর সেখানে বিপুল সংখ্যক ভক্তের সমাগম হয়। তাঁর আয়োজিত ‘দৈব দরবার’ বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়। অনুগামীদের দাবি, মানুষের সমস্যার কথা না জেনেও তিনি নাকি তা বলে দিতে পারেন এবং আধ্যাত্মিক উপায়ে সমাধানের পথ দেখান।
‘অলৌকিক ক্ষমতা’ নিয়ে বিতর্ক
ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তাঁর এই ‘দৈব’ ক্ষমতার দাবি। তাঁর ভক্তদের একাংশের বিশ্বাস, তিনি মানুষের মনের কথা বুঝতে পারেন। এমনকি ‘ভূত তাড়ানো’র দাবিও তাঁকে ঘিরে প্রচারিত হয়েছে।
তবে এই দাবিগুলি নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। যুক্তিবাদী শ্যাম মানব প্রকাশ্যে তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিতর্কে অংশ নেওয়ার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে কুসংস্কার ছড়ানোর অভিযোগও উঠেছে। ‘অখিল ভারতীয় অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি’ নাগপুর পুলিশের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগও দায়ের করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে ওই অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হননি।
সমাজসেবা ও ধর্মীয় কর্মসূচি
বাগেশ্বর ধামে ‘অন্নপূর্ণা কিচেন’-এর মাধ্যমে ভক্তদের বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানা যায়। দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বিয়ের জন্যও বার্ষিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তিনি। পাশাপাশি বৈদিক শিক্ষা ও সংস্কৃত ভাষার প্রসারের উদ্দেশ্যে একটি বৈদিক গুরুকুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
২০২১ সালে একটি ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচির মাধ্যমে কয়েকশো মানুষকে পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনার দাবিও তাঁকে ঘিরে রয়েছে। প্রাণনাশের হুমকির পর ২০২৩ সালে তাঁর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমাজমাধ্যমে বিপুল অনুসারী
ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের জনপ্রিয়তা শুধু ধর্মীয় সভা বা বাগেশ্বর ধামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজমাধ্যমেও তাঁর বিশাল উপস্থিতি রয়েছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা কয়েক দশক লক্ষে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাঁর ধর্মীয় বক্তব্য এবং সভার ভিডিয়ো নিয়মিত ভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
হিন্দুত্বের রাজনীতিতে ক্রমশ সক্রিয়
প্রথম দিকে তাঁর বক্তৃতার মূল বিষয় ছিল ধর্ম ও হনুমানভক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তাঁর বক্তব্যে হিন্দুত্বের রাজনৈতিক সুর আরও স্পষ্ট হয়েছে। নিজেকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র যোদ্ধা’ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন তিনি। ধর্মান্তরের বিরুদ্ধে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছেন।
এই জনপ্রিয়তার কারণে মধ্যপ্রদেশের বাইরেও তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। বিজেপির পাশাপাশি কংগ্রেসও অতীতে তাঁর জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মোদীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে চর্চা
বাগেশ্বর বাবার সঙ্গে বিজেপির ঘনিষ্ঠতা নিয়েও বহু বার আলোচনা হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাগেশ্বর ধামে গিয়ে ‘বাগেশ্বর ধাম মেডিক্যাল অ্যান্ড সায়েন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর শিলান্যাস করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানে মোদী ধীরেন্দ্রকৃষ্ণকে ‘ছোট ভাই’ বলে সম্বোধন করেছিলেন।
এর পর থেকেই জাতীয় রাজনীতিতেও তাঁর প্রভাব নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড-সহ একাধিক রাজ্যে তাঁর ধর্মীয় কর্মসূচিতে বড় জমায়েত হয়েছে।
বাংলায় এসে নতুন বিতর্ক
এ বার দুর্গাপুজোর আগে বাংলায় এসে তাঁর মন্তব্যই নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। লিলুয়ার ‘হনুমান কথা’ অনুষ্ঠানে ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ বলেন, নবরাত্রির সময়ে দুর্গাপুজোর মণ্ডপের আশপাশে আমিষ খাবার বিক্রি বা খাওয়া তাঁর পছন্দ নয়। বাংলার হিন্দুদের উদ্দেশে তিনি প্রতিমার পাশে আমিষ বিক্রি বন্ধ করার আবেদন জানান।
তাঁর অনুষ্ঠানে রাজ্যের একাধিক বিজেপি নেতা ও জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিও নজর কেড়েছে। ফলে ধর্মীয় বক্তব্যের পাশাপাশি ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। তবে তাঁর বক্তব্য এবং তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন দাবি—বিশেষত অলৌকিক ক্ষমতার বিষয়গুলি—বিশ্বাস, দাবি ও বিতর্কের জায়গাতেই রয়েছে; সেগুলিকে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।