চাঁদে মরচে পড়ছে পৃথিবীর অক্সিজেনে!!
শ্বাস নেওয়ার মতো অক্সিজেন নেই, তবু চাঁদের মাটিতে মরচে! শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এটাই সত্যি। সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, চাঁদের মেরু অঞ্চলে যে মরচে বা হেমাটাইট (Fe₂O₃) তৈরি হচ্ছে, তার নেপথ্যে দায়ী পৃথিবী নিজেই। আমাদের এই নীল গ্রহ থেকেই অক্সিজেন কোনওভাবে “লিক” হয়ে গিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে চাঁদে — আর সেখানেই শুরু হচ্ছে জারণের খেলা।
চাঁদে অক্সিজেন থাকলেও তা গ্যাস আকারে নয়, বরং খনিজ আকারে মাটির গভীরে থাকে। আর মরচে ধরার জন্য শুধু অক্সিজেনই নয়, দরকার জারণ বা অক্সিডেশন প্রক্রিয়ার উপযুক্ত পরিবেশ। ফলে, কয়েক বছর আগে যখন চাঁদের মাটিতে মরচের মতো হেমাটাইটের অস্তিত্ব পাওয়া গেল, বিজ্ঞানীরা তাজ্জব হয়ে গেলেন। কারণ সাধারণত অক্সিজেন ছাড়া লোহা মরচে ধরতে পারে না। তাহলে এমনটা ঘটল কী করে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু হয় দীর্ঘ গবেষণা। আর তার ফলেই সামনে আসে চমকপ্রদ সত্য। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে সামান্য পরিমাণ অক্সিজেন আয়ন মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা চাঁদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পূর্ণিমার সময়, যখন চাঁদ পৃথিবীর ছায়ায় অবস্থান করে এবং সূর্যের বিপরীতে থাকে, তখন সৌরবাতাসের প্রভাবে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র (magnetotail) সূর্যের বিপরীত দিকে প্রসারিত হয়। ঠিক সেই সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কিছু অক্সিজেন আয়ন চৌম্বকক্ষেত্র বরাবর ভেসে গিয়ে চাঁদের মেরু অঞ্চলে পৌঁছায়।
এই বিশেষ সময়ে সৌরবাতাসের মাধ্যমে আসা হাইড্রোজেন চাঁদে প্রবেশ করতে পারে না। সাধারণত হাইড্রোজেন ইলেকট্রন দান করে জারণ প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়, কিন্তু পূর্ণিমার সময় পাঁচ দিনের জন্য এই বাধা সরিয়ে যায়। আর তখনই অক্সিজেন ও লোহার সংস্পর্শে ঘটে জারণ, তৈরি হয় হেমাটাইট — অর্থাৎ চাঁদের পৃষ্ঠে দেখা দেয় মরচে।
প্রকৃতপক্ষে, মরচে ধরার জন্য দরকার তিনটি জিনিস — লোহা, অক্সিজেন এবং জল বা আর্দ্রতা। চাঁদে জল না থাকলেও অক্সিজেন আয়ন আর লোহার সংমিশ্রণ যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমাণিত হচ্ছে মরচে ধরানোর জন্য। পৃথিবীর বাতাস থেকে বেরিয়ে আসা এই অক্সিজেন আয়নই হয়ে উঠছে চাঁদের পৃষ্ঠের জারণের মূল চালিকাশক্তি।
গবেষকরা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে এই তত্ত্ব যাচাই করেছেন। তাঁরা চাঁদের মাটিতে পাওয়া খনিজের মতো উপাদান ব্যবহার করে দেখেছেন, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে আসা অক্সিজেন আয়নের বিকিরণে সত্যিই হেমাটাইট তৈরি হয়। তাঁদের ভাষায়, “আমাদের পরীক্ষার ফল প্রমাণ করে, চাঁদে মরচে ধরানোর পেছনে জারক হিসাবে কাজ করছে পৃথিবীর বাতাস।”
এই আবিষ্কার শুধু চাঁদের ভূতত্ত্বই নয়, পৃথিবী ও চাঁদের সম্পর্ক নিয়েও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। এত দিন ধরে চাঁদকে আমরা একা, অক্সিজেনহীন এক জগত হিসেবে ভেবেছি। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, পৃথিবীর প্রভাব চাঁদের পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায়, এমনকি তার রাসায়নিক গঠনের উপরও প্রভাব ফেলে।
অর্থাৎ, চাঁদ একেবারে স্বতন্ত্র নয় — তার গঠন ও পরিবর্তনের গল্পে পৃথিবীর ভূমিকাও কম নয়। আর সেই কারণেই আজ চাঁদের মেরু অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে মরচের ছোপ, যা আসলে পৃথিবীর “শ্বাস” নিয়ে তৈরি।