ঘৃণাভাষণ রুখতে কড়া আইন কর্নাটকে!
কর্নাটক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াল ঘৃণাভাষণ ও ঘৃণাপরাধ (প্রতিরোধ) বিলকে ঘিরে। তীব্র বিরোধিতা, প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ সত্ত্বেও রাজ্য বিধানসভা ও বিধান পরিষদ— দুই কক্ষেই পাশ হয়ে গেল এই বিল। কংগ্রেস শাসিত কর্নাটক সরকারের দাবি, সমাজে বিদ্বেষ, ধর্মীয় উস্কানি এবং বিভাজনমূলক বক্তব্য রুখতেই এই আইন প্রয়োজন। অন্য দিকে বিজেপি এবং তাদের সহযোগী দল জেডিএসের অভিযোগ, এই আইন আসলে বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করার হাতিয়ার হতে চলেছে।
গত ৪ ডিসেম্বর মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া এবং উপমুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমারের উপস্থিতিতে কর্নাটক মন্ত্রিসভা এই বিলের অনুমোদন দেয়। তার পর ১০ ডিসেম্বর রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের মন্ত্রী জি পরমেশ্বর বিধানসভায় বিলটি পেশ করেন। দীর্ঘ বিতর্ক ও বাদানুবাদের পর বৃহস্পতিবার নিম্নকক্ষে এবং শুক্রবার উচ্চকক্ষ বিধান পরিষদে বিলটি পাশ হয়। বিরোধী বিধায়করা সভাকক্ষের ভিতরে ও বাইরে বিক্ষোভ দেখান, স্লোগান তোলেন এবং ওয়াকআউটও করেন। তবু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিল পাশ করাতে সক্ষম হয় শাসক দল।
এই আইনে ঘৃণাভাষণ বা ঘৃণাপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বাধিক ১ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, সামাজিক মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানো, ধর্ম, জাতি, ভাষা বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উস্কানি দেওয়াকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। সরকারের বক্তব্য, সাম্প্রতিক কালে রাজ্যে ঘৃণাভাষণ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনা বেড়েছে। সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতেই এই কঠোর আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে।
বিল পাশ হওয়ার পর বিজেপি এবং জেডিএস এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, কংগ্রেস সরকার এই আইনের মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চাইছে। বিজেপির শীর্ষ নেতারা বলেছেন, সরকারের সমালোচনা করলেই তা ঘৃণাভাষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশীর দাবি, এই আইন কার্যকর হলে সাধারণ মানুষের কথা বলার অধিকার খর্ব হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
অন্য দিকে কংগ্রেসের যুক্তি, এই আইন কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শকে নিশানা করার জন্য নয়। বরং সমাজে শান্তি, সহাবস্থান এবং সংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষা করাই এর মূল উদ্দেশ্য। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার বক্তব্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে অন্যের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর স্বাধীনতা নয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা দুর্বল জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ভাষা ব্যবহার বন্ধ করতেই এই আইন প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক অতীতে কর্নাটকে একাধিক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে ধর্মীয় উস্কানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগ উঠেছে। আদালতও কয়েকটি ক্ষেত্রে কড়া মন্তব্য করেছে। এই প্রেক্ষাপটেই রাজ্য সরকার ঘৃণাভাষণ প্রতিরোধে আইনি কাঠামো আরও শক্ত করার পথে হাঁটল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
এখন এই বিল আইনে পরিণত হওয়ার জন্য রাজ্যপালের সম্মতির অপেক্ষা। তবে তার আগেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। এক পক্ষের মতে, এই আইন সামাজিক সম্প্রীতির জন্য জরুরি। অন্য পক্ষের আশঙ্কা, এটি রাজনৈতিক মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। কর্নাটকে এই আইন কার্যকর হলে তার প্রয়োগ কী ভাবে হয়, সেটাই আগামী দিনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।