কলকাতায় নামফলক ও সাইনবোর্ডে বাংলার ব্যবহার
কলকাতা শহরের সংস্কৃতিতে বাংলা ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। এবার সেই ভাষাকে আরও বেশি প্রচারের আলোতে আনার জন্য কলকাতা পুরসভা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি, পুরসভার তরফ থেকে একটি নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, শহরের সব ধরনের বিজ্ঞাপন হোর্ডিং, দোকানের সাইনবোর্ড, সরকারি দফতরের নামফলক থেকে শুরু করে রাস্তার নামফলক—সবই এখন থেকে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলায় লেখা হবে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ২৬ অক্টোবর কলকাতা পুরসভার মাসিক অধিবেশনে ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি বিশ্বরূপ দে’র প্রস্তাব, যেখানে তিনি জানান যে, বাংলা ভাষা সম্প্রতি ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই, কলকাতা শহরের সব ধরনের সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষা থাকতে হবে। এই প্রস্তাবের সাথে মেয়র সম্মতি জ্ঞাপন করেন এবং তৎকালীন সময়েই পুরসভার সচিব স্বপনকুমার কুণ্ডু এই বিজ্ঞপ্তি জারি করেন।
কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে ২৬ নভেম্বর লালবাজারে চিঠি পাঠানো হয়, যেখানে শহরের সমস্ত থানার কাছে এই নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া হয়। থানা এলাকায় ব্যবসায়ীদের দফতরের নামফলকে বাংলা ভাষায় লেখা কার্যকর করার জন্য থানার ওসি-দের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। পুরসভার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, “বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। শহরের অনেক দোকান বা রেস্তরাঁর নামফলকে বাংলা লেখা থাকে না, এখন থেকে সেই নামফলকে বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক হবে।”
পুরসভা সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আগেই শহরের সব দোকান, রেস্তরাঁ, ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নামফলকে বাংলায় লেখা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরসভা ও কলকাতা পুলিশের সমন্বয়ে এই নীতি বাস্তবায়িত হবে। অতীতে, বাম সরকারের সময়েও এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এবার পুরসভা তা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে চায়, যাতে বাংলা ভাষার গুরুত্ব আরও বেশি বৃদ্ধি পায়।
এই উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও তাদের মতামত দিয়েছেন। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, “এটা অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। বাংলা ভাষার গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য নামফলকে বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।” তিনি আরও যোগ করেন, “সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এই বিষয়ে আন্দোলন করেছিলেন, কিন্তু সে সময়ে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এখন এই উদ্যোগটি সঠিক পথে এগোচ্ছে।”
অন্যদিকে, সাহিত্যিক তিলোত্তমা মজুমদার মন্তব্য করেন, “এটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ, তবে শুধুমাত্র নামফলক নয়, বাংলা ভাষা শিক্ষা প্রত্যেক স্তরে বাধ্যতামূলক করা উচিত। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা পড়ানো না হলে নতুন প্রজন্ম বাংলা শিখতে আগ্রহী হবে না।” তিনি মনে করেন, বাংলা ভাষা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য এই পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
এভাবে, কলকাতা পুরসভার নতুন উদ্যোগটি বাংলা ভাষার প্রতি আরও শ্রদ্ধা ও গুরুত্ব প্রদানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শহরের প্রতিটি কোণায় বাংলার উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলে, শহরের সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হবে এবং বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা আরও গাঢ় হবে।