একসঙ্গে শুরু, তবু জেট ইঞ্জিনে কেন ভারতের থেকে অনেক এগিয়ে চিন?
প্রযুক্তির দুনিয়ায় ভারত গত কয়েক বছরে একের পর এক সাফল্য পেয়েছে। মহাকাশ অভিযান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন কিংবা নিজস্ব যুদ্ধবিমান— বহু ক্ষেত্রেই অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। তবু একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এখনও পিছিয়ে রয়েছে ভারত— যুদ্ধবিমানের জেট ইঞ্জিন প্রযুক্তি। অন্য দিকে, প্রায় একই সময়ে গবেষণা শুরু করেও আজ চিন নিজস্ব ইঞ্জিনে আধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরি করছে। প্রশ্ন উঠছে, কী ভাবে এতটা এগিয়ে গেল বেজিং?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরির সবচেয়ে কঠিন অংশ হল তার ইঞ্জিন। বিমানটির গতি, উচ্চতা, বহনক্ষমতা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকার ক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করে এই প্রযুক্তির উপর। বর্তমানে চিন বছরে প্রায় ২৫০টি যুদ্ধবিমান উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করেছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি। তাদের জে-১০সি বা জে-২০-এর মতো যুদ্ধবিমানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় ডব্লিউএস-১০ ও ডব্লিউএস-১৫ সিরিজের ইঞ্জিন।
অন্য দিকে, ভারতের তেজস এখনও মার্কিন সংস্থা জেনারেল ইলেকট্রিকের এফ-৪০৪ ইঞ্জিনের উপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতের তেজস মার্ক-২-এও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে জিই-এর এফ-৪১৪ ইঞ্জিন। ফলে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে যুদ্ধবিমান নির্মাণের লক্ষ্য এখনও পূরণ হয়নি।
মজার বিষয় হল, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় একই সঙ্গে জেট ইঞ্জিন তৈরির উচ্চাভিলাষী প্রকল্প শুরু করেছিল ভারত ও চিন। কিন্তু এরপর দুই দেশের পথ একেবারেই আলাদা হয়ে যায়। চিন প্রথম দিকে সোভিয়েত প্রযুক্তির উপর নির্ভর করলেও পরে রুশ ইঞ্জিনের ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বহু বছরের ব্যর্থতা, হাজার হাজার প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং বিপুল সরকারি বিনিয়োগের পর তারা ধীরে ধীরে নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিন তৈরি করতে সক্ষম হয়।
চিনের এই সাফল্যের পেছনে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। গবেষণা, ধাতুবিদ্যা, উৎপাদন এবং শিল্পক্ষেত্রকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ২০১৬ সালে অ্যারো ইঞ্জিন কর্পোরেশন অফ চায়না গঠন করে জেট ইঞ্জিন গবেষণাকে আরও গতি দেওয়া হয়।
ভারতের গল্প অবশ্য আলাদা। ১৯৮৬ সালে ডিআরডিও ‘কাবেরী’ জেট ইঞ্জিন প্রকল্প শুরু করেছিল। কিন্তু ১৯৯৮ সালের পোখরান পরমাণু পরীক্ষার পর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও উপকরণ সংগ্রহে বড় বাধার মুখে পড়ে প্রকল্পটি। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল বিশেষ টারবাইন ব্লেড তৈরি করা। এই প্রযুক্তিতেই এখনও পিছিয়ে রয়েছে ভারত।
ফলে দেশীয় ইঞ্জিন তৈরির কাজ দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত হয়েছে এবং যুদ্ধবিমান প্রকল্পগুলিও তার প্রভাব অনুভব করেছে। বর্তমানে কেন্দ্র সরকার একদিকে বিদেশি সংস্থার সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দেশীয় গবেষণায় নতুন করে বিনিয়োগও বাড়িয়েছে। কাবেরী ইঞ্জিনের একটি পরিবর্তিত সংস্করণ ইতিমধ্যে ‘ঘাতক’ স্টেলথ ড্রোনে ব্যবহারের জন্য উন্নয়ন করা হচ্ছে।
তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনের সাফল্যকে অতিরঞ্জিত করাও ঠিক হবে না। এখনও মার্কিন, ব্রিটিশ বা ফরাসি জেট ইঞ্জিন প্রযুক্তির সমকক্ষ হতে পারেনি তারা। অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তাই ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন বড়, তেমনই সম্ভাবনাও কম নয়। উন্নত ধাতুবিদ্যা, দেশীয় গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে ভবিষ্যতে এই ব্যবধান অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?