আরশোলা বনাম পরজীবী!
ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন সংযোজন— তবে তা বাস্তবের নির্বাচনী ময়দানে নয়, বরং ব্যঙ্গ ও মিম-সংস্কৃতির জগতে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র পর আত্মপ্রকাশ করেছে ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ (এনপিএফ)। দুই সংগঠনই নিজেদের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ আন্দোলনের অংশ বলে দাবি করছে। সামাজিক মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ, হতাশা এবং হাস্যরস মিলিয়ে তারা তৈরি করেছে এক অভিনব ডিজিটাল আন্দোলন।
সূচনা কী ভাবে?
ঘটনার সূত্রপাত সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য ঘিরে। এক মামলার শুনানিতে তিনি বলেন, কিছু বেকার তরুণ-তরুণী সাংবাদিকতা বা সমাজমাধ্যমের মাধ্যমে অন্যদের আক্রমণ করেন এবং তাঁদের আচরণ অনেকটা ‘আরশোলা’র মতো। পরে অবশ্য প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে জানান, তাঁর মন্তব্যকে ভুল ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং তিনি গোটা যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলেননি।
কিন্তু ততক্ষণে সমাজমাধ্যমে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
কী এই ককরোচ জনতা পার্টি?
সিজেপি নিজেকে “অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর” বলে পরিচয় দেয়। তাদের দাবি, সমাজের প্রান্তিক, হতাশ এবং ক্রমাগত চাপের মধ্যে থাকা তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করছে তারা। দলের সদর দফতরের বর্ণনা— “যেখানেই ওয়াইফাই কাজ করে”।
দলের সদস্য হওয়ার জন্যও রয়েছে মজার ‘যোগ্যতা’:
- বেকার হতে হবে
- সারাক্ষণ অনলাইনে থাকতে হবে
- পেশাগত ক্ষোভ প্রকাশে দক্ষ হতে হবে
দল চালু হওয়ার প্রথম দু’দিনেই হাজার হাজার মানুষ সদস্যপদ নেয়। পরে ইনস্টাগ্রামে সিজেপির ফলোয়ার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং তা কয়েকটি মূলধারার রাজনৈতিক দলের থেকেও বেশি হয়ে যায়।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা কে?
এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছেন অভিজিৎ দীপকে। তিনি এক জন রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ। পুণে থেকে সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করে পরে আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার জন্য যান। বর্তমানে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন।
২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আম আদমি পার্টির সমাজমাধ্যম দলে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবেও কাজ করেছেন তিনি। ডিজিটাল প্রচার এবং মিম-ভিত্তিক রাজনৈতিক যোগাযোগে তাঁর অভিজ্ঞতাই সিজেপির ভাইরাল সাফল্যের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এনপিএফ: পরজীবীদের পাল্টা জবাব
সিজেপির উত্থানের কিছু দিনের মধ্যেই জন্ম নেয় ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ বা এনপিএফ। এই সংগঠন নিজেদের এমন এক গোষ্ঠী হিসাবে তুলে ধরছে, যারা সমাজের তথাকথিত “পরজীবী” তকমাকে ব্যঙ্গ করে উল্টে প্রশ্ন তুলছে— আসল পরজীবী কারা?
এনপিএফের বক্তব্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষ এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে বেঁচে থাকে যেখানে ক্ষমতাবানরা লাভবান হন আর সাধারণ নাগরিকরা শোষিত হন। তাই তাদের আন্দোলন মূলত রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, দুর্নীতি এবং ভাঙা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
দুই দলের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
সিজেপি
- নিজেদের আরশোলার সঙ্গে তুলনা করে
- চাপের মধ্যেও টিকে থাকার প্রতীক হিসাবে ‘ককরোচ’ ব্যবহার করে
- বেকারত্ব ও তরুণদের হতাশাকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরে
এনপিএফ
- “পরজীবী” শব্দটিকে রাজনৈতিক রূপক হিসাবে ব্যবহার করে
- সমাজের ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্ন করে
- রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমালোচনায় বেশি জোর দেয়
মজার ইস্তাহার, কিন্তু বাস্তব ইঙ্গিত
দুই সংগঠনই নিজেদের “নির্বাচনী ইস্তাহার” প্রকাশ করেছে। যদিও সেগুলি ব্যঙ্গাত্মক, তবু বাস্তব সমস্যার ইঙ্গিত স্পষ্ট।
সিজেপির কিছু দাবি:
- অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিদের রাজ্যসভায় মনোনয়নে নিষেধাজ্ঞা
- সংসদে ৫০ শতাংশ নারী সংরক্ষণ
- দলবদলকারী সাংসদ ও বিধায়কদের দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচনী নিষেধাজ্ঞা
- সিবিএসই-র পুনঃমূল্যায়ন ফি বাতিল
- নিট প্রশ্নফাঁসে ক্ষতিগ্রস্ত পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ানো
অন্য দিকে এনপিএফ নিজেদের এমন এক আন্দোলন বলে দাবি করছে, যারা “ভাঙা ব্যবস্থার ভিতর থেকেই পরিবর্তন” আনতে চায়।
কেন এত জনপ্রিয় হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই সংগঠনের জনপ্রিয়তার নেপথ্যে রয়েছে তিনটি বিষয়:
- তরুণদের বেকারত্বজনিত হতাশা
- রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস
- মিম ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর নতুন সংস্কৃতি
বাস্তব রাজনৈতিক দল না হয়েও সিজেপি ও এনপিএফ দেখিয়ে দিয়েছে, সমাজমাধ্যমে ব্যঙ্গই এখন শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাষা হয়ে উঠতে পারে।
শেষ কথা
আরশোলা বনাম পরজীবী— শুনতে মজার লাগলেও এর ভিতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক বার্তা। তরুণ প্রজন্ম সরাসরি রাজনীতিতে না নামলেও তারা যে রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে ভাবছে, প্রশ্ন তুলছে এবং নিজেদের ভাষায় প্রতিবাদ করছে, এই দুই আন্দোলন তারই প্রমাণ।
এখনও পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি না পেলেও, সিজেপি এবং এনপিএফ ইতিমধ্যেই ডিজিটাল ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।
স্ট্রোকের পর কেমন আছেন রাহুল রায়? পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে গুজবে মুখ খুললেন অভিনেতা