নানা পটেকরের জীবন ছিল সিনেমার চেয়েও বেশি নাটকীয়!
‘ক্রান্তিবীর’-এর প্রতাপনারায়ণ তিলক থেকে ‘ওয়েলকাম’-এর উদয়—বহু বিচিত্র চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন নানা পটেকর। কিন্তু পর্দার বাইরেও তাঁর জীবন ছিল কম ঘটনাবহুল নয়। অভিনয়ের পাশাপাশি সেনাজীবন, ব্যক্তিগত শোক, সমাজসেবা এবং নানা বিতর্ক তাঁকে বার বার আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।
নানার আসল নাম বিশ্বনাথ পটেকর। মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ-জাঞ্জিরার এক মরাঠি পরিবারে জন্ম তাঁর। মুম্বইয়ের জেজে স্কুল অফ আর্টে পড়াশোনা করার পর থিয়েটারের মাধ্যমে অভিনয়জগতে পা রাখেন। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবিতে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের শুরু।
‘পরিন্দা’য় গ্যাংস্টারের চরিত্র তাঁকে বড় সাফল্য এনে দেয়। ওই ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তিনি। পরে ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসাবেও আত্মপ্রকাশ করেন। ‘তিরঙ্গা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নি সাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজ়িক্যাল’, ‘অপহরণ’, ‘ওয়েলকাম’, ‘নটসম্রাট’—একাধিক ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। ‘ক্রান্তিবীর’-এর জন্য সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কারও পান তিনি। ২০১৩ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়।
তবে ব্যক্তিজীবনে নানা গভীর শোকের মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৭৮ সালে নীলকান্তিকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের প্রথম সন্তান দুর্বাসা মাত্র দু’বছর বয়সে শারীরিক অসুস্থতায় মারা যায়। পরে তাঁদের আর এক পুত্র মল্লার জন্মান।
নানার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও একাধিক সম্পর্কের গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা এবং পরে আয়েশা জুলকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা বলিপাড়ায় আলোচিত হয়। এসব নিয়ে তাঁর বৈবাহিক জীবনেও অশান্তির কথা শোনা যায়। তবে সম্পর্ক সংক্রান্ত এই তথ্যগুলি দীর্ঘদিনের সংবাদমাধ্যমের গুঞ্জন হিসাবেই আলোচিত হয়েছে।
২০১৮ সালে অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত নানার বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ প্রকাশ্যে আনেন। ‘হর্ন ওকে প্লিজ়’-এর শুটিংয়ের সময় তাঁকে হেনস্থার অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগ ঘিরেই বলিউডে ‘মি টু’ আন্দোলন নতুন করে তীব্র হয়। পরে নানার বিরুদ্ধে এফআইআর-ও দায়ের হয়। ২০১৯ সালে মুম্বই পুলিশ ‘বি-সামারি’ রিপোর্ট জমা দিয়ে তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়। তনুশ্রী অবশ্য সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
অভিনয়ের বাইরে নানার আর একটি পরিচয় ছিল সেনা কর্মকর্তা হিসেবে। ১৯৮৮ সালে টেরিটোরিয়াল আর্মিতে ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দেন তিনি। ‘প্রহার’-এর প্রস্তুতির জন্য তিন বছর সামরিক প্রশিক্ষণও নেন। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় মরাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রিতে মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদায় অবসর নেন।
কৃষকদের জন্য ‘নাম ফাউন্ডেশন’ তৈরি করেও কাজ করেছেন নানা। মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ এলাকায় কৃষক ও তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো ছিল এই সংস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।
মৃত্যু নিয়েও বরাবরই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অন্য রকম। নিজের শেষকৃত্য নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তাঁর জন্য শুকনো কাঠ ব্যবহার করা হোক। কারণ ভেজা কাঠে বেশি ধোঁয়া হবে, আর সেই ধোঁয়ায় উপস্থিত মানুষের চোখে জল আসবে—তখন কে শোকে কাঁদছেন আর কে ধোঁয়ার জন্য, তা বোঝা যাবে না।
সেই রসবোধ, তীক্ষ্ণ জীবনদর্শন এবং অসামান্য অভিনয়ের স্মৃতি নিয়েই বৃহস্পতিবার ৭৫ বছর বয়সে চলে গেলেন নানা পটেকর। ‘ক্রান্তিবীর’-এর সেই সংলাপ যেন তাঁর বিদায়ের মুহূর্তেও ফিরে আসে—মৃত্যুকে নিয়েও যিনি শেষ পর্যন্ত নিজের মতো করেই কথা বলেছিলেন।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।