আলট্রাসাউন্ডে কথা বলে গাছ ও পোকা!
গাছেরও যে কথা বলার নিজস্ব ভাষা থাকতে পারে, তা কি আগে কেউ ভাবতে পেরেছিলেন? ইজরায়েলের এক দল গবেষক এবার এমনই এক অভিনব আবিষ্কারের দাবি করেছেন। তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে, গাছ এবং পোকামাকড়ের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হয় অদৃশ্য আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে! এই রহস্যময় ‘শব্দ’ চোখে দেখা যায় না, কানে শোনা যায় না। কিন্তু গাছ ও পোকা নিজেদের প্রয়োজন মতো এমন শব্দ ব্যবহার করেই কথা বলে।
ইজরায়েলের তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের এই চমকপ্রদ গবেষণা ইতিমধ্যেই বিজ্ঞান মহলে আলোড়ন তুলেছে। তাঁরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং পোকামাকড় একে অপরের সঙ্গে এমন শব্দতরঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে, যা মানব কানে শোনা যায় না। বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে এই আলট্রাসাউন্ড ধরা পড়েছে।
গবেষকদের মতে, যখন কোনও গাছ শুষ্কতার মতো পরিবেশগত চাপের মধ্যে পড়ে কিংবা কাটা পড়ে, তখন সে একটি নির্দিষ্ট আলট্রাসাউন্ড তরঙ্গ নির্গত করে। আশেপাশের পোকা বা অন্য উদ্ভিদ এই সংকেত পায় এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেখায়। পোকাগুলোও আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে গাছকে তাদের উপস্থিতি বা বিপদের কথা জানান দেয়। এই যোগাযোগকে বিজ্ঞানীরা বলছেন একধরনের ‘সাইলেন্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’।
তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিলাচ হাদানি জানান, “আমরা বহু দিন ধরে ভাবতাম, গাছ শুধু রাসায়নিক বার্তার মাধ্যমে অন্য উদ্ভিদ বা পোকামাকড়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু এবার প্রমাণ হল, শব্দও তার বড় মাধ্যম।”
গবেষণার সময় তাঁরা বিভিন্ন গাছের চারপাশে অত্যাধুনিক মাইক্রোফোন বসিয়েছিলেন। দেখা যায়, ধরা পড়ছে এমন সব শব্দ, যেগুলো মানুষের কানে শোনা যায় না। ওই শব্দগুলির ফ্রিকোয়েন্সি ছিল ২০ থেকে ১০০ কিলোহার্টজের মধ্যে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, টমেটো গাছ যখন জল না পায়, তখন প্রতি ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪০ বার এমন শব্দ পাঠায়। ধূমপান করলে যেমন শরীরে ক্ষতি হয়, তেমনি গাছের এই সংকেতও জীববৈচিত্র্যের উপর প্রভাব ফেলে।
গবেষক দল জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এই আবিষ্কার কৃষিক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যদি গাছের এই শব্দ সংকেত শুনে আগেই বুঝে ফেলা যায় তার কী প্রয়োজন, তবে জলসেচ কিংবা সার দেওয়ার মতো কাজ আরও নিয়ন্ত্রিত এবং সঠিক সময়ে করা সম্ভব হবে।
এই গবেষণায় শুধু টমেটো গাছ নয়, তামাক গাছ এবং শস্যজাতীয় অন্যান্য উদ্ভিদের উপরও পরীক্ষা করা হয়েছে। একই ধরণের আলট্রাসাউন্ড বার্তা পাওয়া গেছে সেখানে। গবেষকরা আরও বলছেন, শুধু গাছ নয়, পোকামাকড়ও এমন শব্দতরঙ্গ পাঠায়। বিশেষত মৌমাছি বা মথেরা গাছকে জানায় তারা কোথায় আছে, ফুলের অবস্থান কী। এতে পরাগায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া সহজ হয়।
এই রহস্যময় উদ্ভিদ-প্রাণী সংলাপ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখন নতুন উৎসাহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এটি পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কৃষিক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। গাছেরও যে কথা থাকে— এবার সেটাই যেন বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত হল।