বুধ থেকে এল উল্কাপিণ্ড?
আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির বুকে বছর দুয়েক আগে পড়ে থাকা দুটি রহস্যময় উল্কাপিণ্ড ঘিরে বৈজ্ঞানিক মহলে তীব্র আলোড়ন ছড়িয়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে—এই দুই মহাজাগতিক শিলাখণ্ড হয়তো এসেছে সৌরজগতের সবথেকে রহস্যময় এবং কম পরিচিত গ্রহ, বুধ থেকে!
চাঁদ ও মঙ্গলের থেকে বহু উল্কাপিণ্ড পাওয়া গেলেও বুধের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। সূর্যের এত কাছে থাকার কারণে বুধের চারপাশে পৌঁছানো কঠিন, মানুষের পক্ষে তো বটেই, এমনকি মহাকাশযানের পক্ষেও। এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি মানববিহীন যান বুধের কক্ষপথে গিয়েছে। সেই কারণে বুধের ভূতত্ত্ব ও গঠন সম্পর্কে তথ্য এত দিন বেশ সীমিত ছিল।
২০২৩ সালে সাহারায় খুঁজে পাওয়া উল্কাদুটি—‘নর্থ-ওয়েস্ট আফ্রিকা ১৫৯১৫’ এবং ‘ক্সার ঘিলানে ০২২’—নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন ব্রিটেনের ওপেন ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী বেন রাইডার-স্টোকস ও তাঁর দল। চলতি বছরের জুনে তাঁদের গবেষণা প্রকাশিত হয় ‘ইকারাস’ পত্রিকায়। তাঁদের মতে, দুটি শিলাখণ্ডের রাসায়নিক গঠন, খনিজ উপাদান এবং লোহার অভাব বুধের পৃষ্ঠের সঙ্গে এতটাই মিলে গিয়েছে যে, এগুলি বুধ থেকে আসা বলে ধরে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
বেন জানিয়েছেন, উল্কাদুটিতে অলিভাইন এবং পাইরক্সিন রয়েছে—এগুলি লোহার-ঘাটতিযুক্ত খনিজ, যা বুধের পৃষ্ঠে স্বাভাবিক। তাছাড়া, এই শিলাগুলিতে লোহার ছিটেফোঁটাও নেই, যা বুধের ভূত্বকের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা আরও দেখেছেন, এই দুটি উল্কাপিণ্ডের গঠন পৃথিবী বা অন্য কোনও পরিচিত গ্রহের সাথে খাপ খায় না।
তবে এই গবেষণায় কিছু প্রশ্নও থেকেই যাচ্ছে। কারণ, উল্কাদুটির বয়স আনুমানিক ৪৫০ কোটি বছর, যেখানে বুধের পৃষ্ঠের বেশির ভাগ অংশ গঠিত হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে। এই বয়সের পার্থক্য গবেষকদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করেছে। তবে এখনই বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। বেনের মতে, ‘‘পুরোপুরি নিশ্চিত হতে গেলে বুধ থেকে সরাসরি নমুনা সংগ্রহ করাই একমাত্র উপায়।’’
এর আগে ২০১২ সালে মরক্কোতে পাওয়া ‘নর্থ-ওয়েস্ট আফ্রিকা ৭৩২৫’ নিয়েও এমন দাবি উঠেছিল। কিন্তু পরে তার রাসায়নিক গঠনে বুধের সঙ্গে অমিল ধরা পড়ে। তবে এবারের উল্কাদুটি নিয়ে বিজ্ঞানীরা বেশ আত্মবিশ্বাসী।
জানা গিয়েছে, বুধ থেকে উল্কাপিণ্ড পৃথিবীতে এসে পড়া বেশ কঠিন। সূর্যের অত্যধিক মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পার হয়ে পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছনো বিরল ঘটনা। তবু খাতায়-কলমে সেটি সম্ভব, এবং সাহারায় পাওয়া এই দুটি পাথর সেই বিরল ঘটনারই প্রমাণ হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন অপেক্ষায় রয়েছেন, কবে ‘বেপিকলম্বো’ নামে পরবর্তী মহাকাশযান বুধে গিয়ে সরাসরি তার পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরবে। কিন্তু সেই যাত্রা সম্পূর্ণ হতে আরও সময় লাগবে। তার আগে সাহারার এই দুই পাথরই বুধ গবেষণায় নতুন দরজা খুলে দিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।