ফ্যাশনে সচেতন হলে পৃথিবীও বাঁচে!
সাজগোজ আর ফ্যাশনের দুনিয়ায় পা রাখতে গিয়ে আপনি কি জেনে বুঝে পৃথিবীকে আরও একটু নষ্ট করে ফেলছেন? প্রতি মাসেই যদি ৫-৬টি সস্তা শাড়ি বা জামা কেনেন, শুধু একটি বিয়েবাড়ি বা বেড়ানোর জন্য, আর তারপর আলমারিতে জায়গার অভাবে ফেলে দেন পুরনোগুলো—তাহলে এই প্রশ্নটা একবার ভাবুন।
বর্তমানে অনলাইন কেনাকাটার অভ্যেস, ওয়েবসাইটের অফার আর ‘নতুন কিছুর খোঁজে’ চলা এক মানসিক তাড়নার জন্য আমরা নিজেরাও বুঝে উঠতে পারছি না, আমাদের ফ্যাশন কীভাবে পৃথিবীর উপর এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শাড়ি হোক বা কুর্তা—সিন্থেটিক কাপড়, ডিজিটাল প্রিন্ট, মাইক্রোপ্লাস্টিক বা নানা রাসায়নিকের সংমিশ্রণে তৈরি এসব পোশাক শুধু ফেলে দিলে নয়, তৈরির সময়েও প্রকৃতিকে ধীরে ধীরে বিষিয়ে তোলে।
এই পরিস্থিতিতে যে শব্দটি সামনে আসছে বারবার, তা হল ‘সাস্টেনেবল ফ্যাশন’। এর মানে সহজভাবে বললে দাঁড়ায়—কম কিনুন, ভাবনা-চিন্তা করে ভাল জিনিস কিনুন, আর সেই জিনিসই বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন পরুন। এটাই সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব পথ।
সম্প্রতি কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (CII)-এর উদ্যোগে কলকাতার বেঙ্গল ক্লাবে এক আলোচনাচক্রে এই বিষয়টি সামনে এল। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন ‘Suta’-র দুই প্রতিষ্ঠাতা সুজাতা বিশ্বাস ও তানিয়া বিশ্বাস। তাঁদের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—“পাঁচটা সস্তা জামার চেয়ে একটা ভাল জামা অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। আর সেটাই টিকিয়ে রাখে আমাদের ঐতিহ্যকেও।”
তানিয়ার মতে, একটি ভালো সুতির শাড়িকে ১০ রকমভাবে স্টাইল করে পরা যায়। একই কুর্তাকেও ব্যবহার করা যায় নানা ফর্মে। শুধুমাত্র ট্রেন্ড নয়, ফ্যাশন যেন হয়ে ওঠে রি-ইউসের প্ল্যাটফর্ম। আর সুজাতা সেখানে আরেক ধাপ এগিয়ে বলেন, “যে পোশাকটা আপনি এক বছর পরেননি, সেটিকে নতুন করে সাজিয়ে নিন—ব্যাগ বানান, কুশন কভার তৈরি করুন, বা অন্য কোনো ডিজাইন করে নতুন জামা বানিয়ে নিন। তাতে ফ্যাশনের মধ্যেও পরিবেশবোধ থাকবে।”
এই আন্দোলনের আরেকটি মুখ্য দিক হল দেশীয় হস্তশিল্পকে টিকিয়ে রাখা। বেনারসি, জামদানি, বেগমপুরি কিংবা ধনেখালি—এসব ঐতিহ্যবাহী শাড়ির কদর না বাড়ালে তাঁতি ও কারিগররা হারিয়ে যাবেন। সস্তা সেমি-সিন্থেটিক ফ্যাব্রিকের ভিড়ে হারিয়ে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা শিল্পকলা। সস্তা পণ্য যত বেশি চলবে, তত বেশি পেছনে পড়ে থাকবে আমাদের সংস্কৃতি।
সুতরাং আপনি যখন পরের শপিংয়ের আগে ভাববেন—“পুরনো জামা পরে বিয়েবাড়ি যাওয়া ঠিক হবে?”—তখন আরেকবার ভেবে দেখুন, সেটি যদি সত্যিই টেকসই ফ্যাশনের পথে একটা ছোট পদক্ষেপ হয়। আপনিই পারেন ‘কম কিনে, ভালো বেছে’ এই গ্রহকে আরও একটু সুন্দর করে তুলতে।