মোদী সরকারের উদ্যোগ
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে নামিবিয়া থেকে আটটি চিতা আনা হয়েছিল ভারতে। মধ্যপ্রদেশের কুনো জাতীয় উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে সেগুলির খাঁচা উন্মুক্ত করেছিলেন। এর ঠিক পরের বছর, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আরও ১২টি চিতা আনা হয়। যদিও শুরুতেই এই প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছিল, আফ্রিকার শুকনো সাভানার তুলনায় ভারতের বর্ষা এবং আর্দ্র আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে চিতাগুলির অসুবিধা হচ্ছে।
এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কুনোতে চিতাগুলির মৃত্যু ঠেকাতে আমেরিকা এবং ব্রিটেনের বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, উত্তর আফ্রিকার চিতাগুলি ভারতের আবহাওয়ার সঙ্গে বেশি মানানসই হতে পারে। তা সত্ত্বেও, নতুন বছরে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেই আরও ২০টি চিতা আনার পরিকল্পনা করছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। তবে এবার চিতাগুলির নতুন ঠিকানা হবে মধ্যপ্রদেশের গান্ধীসাগর জাতীয় উদ্যান।
কুনো প্রকল্প: সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ
চিতার পুনর্বাসনের জন্য ভারতের উদ্যোগ ছিল এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। কুনোতে আনা ২০টি চিতার মধ্যে ১২টি চিতা শাবকের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত ১১টি চিতার মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে পূর্ণবয়স্ক এবং শাবক চিতাও রয়েছে। এর ফলে ভারতের আবহাওয়ায় আফ্রিকার চিতার টিকে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে এসেছে।
মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞরা জানান, কুনোর আবহাওয়া চিতাদের জন্য সম্পূর্ণ উপযুক্ত নয়। সেখানকার আর্দ্র আবহাওয়ায় তারা সংক্রমণের শিকার হচ্ছে। তবে নতুন করে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে চিতা আনার পরিকল্পনার মাধ্যমে গান্ধীসাগর জাতীয় উদ্যানে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গান্ধীসাগর: চিতার নতুন ঠিকানা
মধ্যপ্রদেশের গান্ধীসাগর জাতীয় উদ্যানকে চিতাদের জন্য উপযুক্ত বাসস্থান হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এই উদ্যানে প্রথম ধাপে কুনো থেকে একটি মা চিতা এবং তার দুই শাবককে আনা হবে। গান্ধীসাগর পৌঁছাতে কুনো থেকে ছয় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে হবে।
উদ্যানটির মূল বাসস্থান ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এছাড়াও, এর চারপাশে আরও ২,৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ‘বাফার জোন’ হিসেবে রাখা হয়েছে। এই বাফার এলাকায় রয়েছে মাধব জাতীয় উদ্যানসহ কুনো এবং গান্ধীসাগরের মধ্যবর্তী অঞ্চল। চিতাদের খাদ্যের জন্য চিতল হরিণ আনা হয়েছে, যা তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করবে।
চিতার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
গান্ধীসাগরে চিতাদের পুনর্বাসন প্রকল্প ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। যদিও কুনোর অভিজ্ঞতা কিছুটা মিশ্র ছিল, গান্ধীসাগর প্রকল্পে আরও উন্নত পরিকল্পনা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটানো হচ্ছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, নতুন চিতাদের সংক্রমণ ঠেকাতে এবং তাদের আবাসস্থলের মান উন্নত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে তাদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানো হবে।
চিতার পুনর্বাসন প্রকল্পের গুরুত্ব
ভারতের মাটিতে চিতার বিলুপ্তি ঘটে প্রায় ৭০ বছর আগে। চিতার পুনর্বাসন প্রকল্প কেবল বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ নয়, বরং ভারতের পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতেও সাহায্য করবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কেবল চিতা নয়, তাদের খাদ্যশৃঙ্খল এবং বাস্তুতন্ত্রের অন্যান্য উপাদানগুলিও সুরক্ষিত হবে।
তবে প্রকল্পটি সফল করতে আরও পরিশ্রম এবং গবেষণা প্রয়োজন। ভারত সরকারের এই উদ্যোগ বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক মাইলফলক হতে পারে। গান্ধীসাগরে চিতাদের নতুন জীবন শুরু কেবল চিতাদের নয়, গোটা প্রকৃতির জন্যই এক নতুন অধ্যায়।