মনমোহন জমানায় বাংলার রাজনৈতিক পালাবদল
ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংহের শাসনকালের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিশিষ্ট অধ্যায়। তাঁর মৃত্যুর পর রাজ্যের রাজনৈতিক শিবিরগুলির আলোচনায় বারবার উঠে আসছে সেই সময়কালের কথা। বিশেষত, সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের সমর্থন প্রত্যাহার এবং সেই প্রেক্ষাপটে রাজ্যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রসঙ্গ।
বাংলার রাজনীতিতে মনমোহনের শাসনের ভূমিকা
২০০৪ সালে মনমোহন সিংহ যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন বাংলায় ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। লোকসভা নির্বাচনে সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামেরা পশ্চিমবঙ্গে ৩৫টি আসন এবং দেশজুড়ে ৬১টি আসন পেয়ে কংগ্রেসের ইউপিএ সরকার গঠনে বড় ভূমিকা পালন করে। যদিও বামেরা সরাসরি সরকারে যোগ দেয়নি, তারা বাইরে থেকে সমর্থন করেছিল। ‘অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি’র আওতায় শুরু হয়েছিল মনমোহনের প্রথম সরকারের কার্যক্রম।
তবে, এই সহযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০০৮ সালে আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তি নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয় বাম এবং কংগ্রেসের মধ্যে। সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটি স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পদত্যাগের নির্দেশ দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বামেরা কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনে, কিন্তু তাতে সফল হতে পারেনি।
বামেদের পতন এবং তৃণমূলের উত্থান
মনমোহনের শাসনকালেই বাংলায় বামেদের শক্তি শিখরে উঠেছিল এবং তারপরেই তাদের পতনের সূচনা হয়। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট ২৩৫টি আসন এবং ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছিল। কিন্তু তিন বছরের মধ্যেই সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রামের মতো ঘটনাগুলি বামেদের জনপ্রিয়তায় চিড় ধরায়।
পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট বামেদের বড় ধাক্কা দেয়। সেই নির্বাচনে তৃণমূল এক আসন থেকে বেড়ে ১৯টি আসন পায়, আর বামেদের আসন সংখ্যা ৩৫ থেকে কমে দাঁড়ায় ১৫-তে। এই নির্বাচনী ফলাফলের মধ্য দিয়ে বাংলায় বামেদের পতন এবং তৃণমূলের উত্থানের সূচনা হয়।
রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তন
মনমোহনের দ্বিতীয় সরকারের সময়েও বাংলার রাজনীতি নতুন মোড় নেয়। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে। এই জয়ের পেছনে কংগ্রেসের বড় ভূমিকা ছিল। প্রাক্তন কংগ্রেস নেতাদের মতে, সেই সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীর কার্যক্রম এবং কংগ্রেসের সমর্থন মমতার জয়কে নিশ্চিত করেছিল।
তবে, সম্পর্কের এই উষ্ণতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০১২ সালে তৃণমূল মনমোহনের দ্বিতীয় সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। একইভাবে, বাংলায় মমতার সরকার থেকেও কংগ্রেস বেরিয়ে আসে।
রাজনীতির প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ
মনমোহনের শাসনকালের ঘটনাপ্রবাহ বাংলার রাজনীতিতে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। বামেদের সমর্থন প্রত্যাহার তাদের ক্ষয় ত্বরান্বিত করেছিল। অন্যদিকে, তৃণমূল সেই শূন্যস্থানে প্রবেশ করে নিজেদের জমি শক্ত করতে পেরেছিল।
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী স্বীকার করেছেন, ‘‘প্রথম ইউপিএ সরকারের সময়ে ১০০ দিনের কাজ, তথ্য জানার অধিকার আইন, এবং মিড ডে মিলের মতো অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ বামেদের জন্যই সম্ভব হয়েছিল।’’ তবে, তিনি এটাও মেনে নেন যে রাজনীতির স্বার্থে সব পক্ষ সবসময় একমত হতে পারে না।
তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষের মতে, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই সিপিএমকে উৎখাত করার আন্দোলন করছিলেন। কিন্তু বামেদের সমর্থন প্রত্যাহার তৃণমূলের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছিল।’’
শেষ কথা
ড. মনমোহন সিংহের শাসনকাল শুধু জাতীয় রাজনীতির জন্য নয়, বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বামেদের সমর্থন প্রত্যাহার এবং সেই প্রেক্ষিতে তৃণমূলের উত্থান বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। তাঁর শাসনকালের সেই ইতিহাস আজও রাজনীতিবিদদের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।