সৌদি আরবের স্বপ্নের মেগা প্রকল্প ‘দ্য লাইন’ নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভি প্রকাশিত একটি তথ্যচিত্রে দাবি করা হয়েছে, এই প্রকল্পের নির্মাণকাজে যুক্ত হয়ে ভারত, বাংলাদেশ এবং নেপালের প্রায় ২১ হাজার পরিযায়ী শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। তথ্যটি সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক স্তরে তীব্র আলোচনার ঝড় উঠেছে।
হাইপ্রোফাইল প্রকল্পের পেছনে লুকানো দুঃখগাথা
‘দ্য লাইন’ সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের অন্যতম আকাঙ্ক্ষিত প্রকল্প। লোহিত সাগরের তীর থেকে তাবুক প্রদেশ পর্যন্ত প্রায় ১৭০ কিলোমিটার লম্বা এবং ৫০০ মিটার উঁচু কাচের কাঠামোর মধ্যে সম্পূর্ণ স্মার্ট সিটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে গড়ে ওঠা এই শহরে গাড়ি থাকবে না। প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য ২০৩০ সাল। তবে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য শ্রমিকদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।
শ্রমিকদের করুণ অবস্থা
তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে, শ্রমিকদের দিনে প্রায় ১৬ ঘণ্টা কাজ করানো হচ্ছে। পাশাপাশি, তীব্র গরমের মধ্যেও কাজ চালানোর অভিযোগও সামনে এসেছে। আইটিভি দাবি করেছে, অস্বাভাবিক গরমের কারণে বহু শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই ভারত, বাংলাদেশ এবং নেপালের বাসিন্দা।
সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া
তথ্যচিত্রের অভিযোগ সৌদি আরব সরাসরি অস্বীকার করেছে। দেশটির ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘‘প্রকল্পে শ্রমিকদের মৃত্যুর হার প্রতি এক লক্ষে মাত্র ১.১২ জন, যা আন্তর্জাতিক মানের চেয়েও কম।’’ তারা আরও দাবি করেছে, তথ্যচিত্রে ভুল পরিসংখ্যান দেখিয়ে সৌদির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক দাস-বিরোধী সংগঠনের মুখপাত্র বলেছেন, ‘‘সৌদি আরবের রাজপরিবারের দাস ব্যবহারের ইতিহাস নতুন নয়। দরিদ্র দেশ থেকে শ্রমিক এনে এভাবে তাদের জীবন বিপন্ন করা অমানবিক।’’ তবে সৌদি প্রশাসন শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জোর দিচ্ছে বলে দাবি করেছে।
প্রকল্পের চ্যালেঞ্জ
অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এই প্রকল্পে বেশ কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি কাজ করছে। নির্মাণে বড় বাজেট বরাদ্দ করা হলেও কাজের গতি এবং বাজেটের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে চাপের মুখে ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
তথ্যচিত্র প্রকাশিত হওয়ার পর ভারতসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদিও নয়াদিল্লি থেকে সৌদির বিরুদ্ধে এখনো কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে বিষয়টি ভারত-সৌদি কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
‘দ্য লাইন’ প্রকল্প সৌদি আরবের উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন ২০৩০’-এর অংশ হলেও এর নির্মাণে শ্রমিকদের জীবন এবং মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হওয়ার আগে এই বিতর্কের সমাধান হবে কিনা, তা সময়ই বলবে।