‘লায়ন ম্যান’-এর মৃত্যু: পোষ্য সিংহদের আক্রমণে হারালেন প্রাণ

লায়ন ম্যান দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ার উত্তরে অবস্থিত হ্যামানসক্রালের বাসিন্দা লিওন ভ্যান বিলজন, যিনি ‘লায়ন ম্যান’ নামেই বেশি পরিচিত, তিনটি সিংহকে সন্তানের মতো বড় করেছিলেন। কিন্তু, এক মর্মান্তিক ঘটনায় সেই পোষ্য…

November 8, 2024
0 min read

লায়ন ম্যান

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ার উত্তরে অবস্থিত হ্যামানসক্রালের বাসিন্দা লিওন ভ্যান বিলজন, যিনি ‘লায়ন ম্যান’ নামেই বেশি পরিচিত, তিনটি সিংহকে সন্তানের মতো বড় করেছিলেন। কিন্তু, এক মর্মান্তিক ঘটনায় সেই পোষ্য সিংহেরাই তাঁর জীবন শেষ করে দেয়। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে, তিনি যখন সিংহদের থাকার জায়গার বেড়াটি মেরামত করছিলেন, তখন তাঁরই পোষ্য তিনটি সিংহ তাঁকে আক্রমণ করে। সিংহের আক্রমণে তিনি প্রাণ হারান, একটি নয়, তিনটি সিংহের আক্রমণে।

পোষ্যদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক

লিওন ভ্যান বিলজন জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছিলেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে, বিশেষ করে সিংহের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা ছিল। তিনি তিনটি সিংহশাবককে পোষ্য হিসেবে নিয়েছিলেন – দুটি পুরুষ সিংহ এবং একটি সিংহী। তাদের নাম ছিল র‌্যাম্বো, নাকিতা, এবং ক্যাটরিন। এই সিংহশাবকগুলোকে তিনি ছোট থেকেই মানুষ হিসেবে লালনপালন করেছিলেন। সিংহশাবকগুলোর প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল অকৃত্রিম, আর তাদের সঙ্গে ঘুমানো, খেলাধুলা করা তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

লিওন মনে করতেন, সিংহদের সঙ্গে তাঁর এক বিশেষ সম্পর্ক ছিল, যা বন্য প্রাণী এবং মানুষের মধ্যে একটি বন্ধুত্বের মতো। তিনি বিশ্বাস করতেন, পোষ্য সিংহগুলোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অনেক গভীর, এবং এই সম্পর্কেই সিংহরা তাঁকে আক্রমণ করবে না। কিন্তু বাস্তবে, তাদের পাশবিক প্রবৃত্তি হঠাৎ করে জেগে উঠেছিল, যা ভেঙে দিয়েছিল তাঁর আশার দোলাচল।

লায়ন ম্যান

মর্মান্তিক ঘটনা

২০১৯ সালের আগস্ট মাসে, লিওন যখন সিংহদের খাঁচার বেড়া মেরামত করছিলেন, তখন তার পোষ্য সিংহগুলো পেছন থেকে তাঁকে আক্রমণ করে। তিনি বিপদটি আগে টের পাননি এবং কোনো প্রতিরোধের সুযোগ পাননি। প্রথমে একটি সিংহ তাঁর ঘাড় কামড়ে ধরলে, একে একে বাকি সিংহ দুটি আক্রমণ করতে থাকে। তাঁদের আক্রমণে লিওন মুহূর্তের মধ্যে রক্তাক্ত হয়ে পড়েন এবং প্রাণ হারান।

লিওনের কন্যা, লিওনেট ভ্যান উইক সংবাদমাধ্যমে বলেন, “আমরা একসঙ্গে এই খামারে বড় হয়েছি। আমার বাবা সিংহগুলিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি তাদের সঙ্গে ঘুমাতেন এবং তাদের একজন পরিবারের সদস্যের মতো দেখতেন।”

পরিণতি এবং সমালোচনা

লিওনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও, দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। সিংহগুলো এতটাই হিংস্র হয়ে উঠেছিল যে, প্রথমে সেগুলো সরানো সম্ভব হয়নি। পরে, অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, সিংহগুলোকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। সেই সময় চিকিৎসকরা লিওনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন।

এ ঘটনার পাঁচ বছর পর, লিওনের সংরক্ষিত সিংহদের নিয়ে করা কিছু ভিডিও সম্প্রতি ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভিডিওগুলোতে, লিওনের সিংহদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সিংহের সংরক্ষণ বিষয়ক শিক্ষা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ভিডিওগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং এর মাধ্যমে বহু মানুষ তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানায়।

তবে, ঘটনাটি নিয়ে পশু অধিকার কর্মীরা এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থার কর্মকর্তারা তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে বন্য প্রাণীকে পোষ্য হিসেবে রাখা বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে, বন্যপ্রাণীদের প্রাকৃতিক প্রবৃত্তি হঠাৎ করে জেগে উঠতে পারে এবং সেই মুহূর্তে তাদের কাছ থেকে প্রতিরোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বন্যপ্রাণী এবং মানুষের সম্পর্ক

এই ঘটনায় অনেকেই মনে করছেন যে, লিওন একটি মারাত্মক ভুল করেছিলেন। বন্যপ্রাণী এবং মানুষের মধ্যে এমন গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা কখনই নিরাপদ নয়, কারণ বন্যপ্রাণীদের আচরণ পূর্বাভাসযোগ্য নয় এবং তারা কখনোই পুরোপুরি মানবিক আচরণ করে না। এটি মানবসভ্যতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে, যা ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং তাদের সাথে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও সাবধানতা অবলম্বন করার প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে দেয়।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থার কর্মীরা বলছেন, “বন্যপ্রাণীদের যথাযথ সংরক্ষণে মনোযোগ দেওয়া উচিত, এবং তাদেরকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে মানুষের জীবনে আনা উচিত নয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, সিংহ বা অন্যান্য বন্য পশুর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সখ্য গড়ার কোনো প্রয়োজন নেই।”

উপসংহার

লিওন ভ্যান বিলজন, যিনি ‘লায়ন ম্যান’ নামে পরিচিত ছিলেন, তার জীবনের এই দুর্ঘটনা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাঁর সিংহদের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক এবং পোষ্য হিসেবে তাদের বড় করা, একদিকে যেমন তার জন্য আনন্দের ছিল, অন্যদিকে তা একটি বিপদজনক অবস্থানে তাকে ফেলেছিল। এই ঘটনা শুধু লিওনের জীবনকে শেষ করেনি, বরং বন্যপ্রাণীদের পোষ্য হিসেবে বড় করার নৈতিকতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে বড় প্রশ্ন উঠিয়েছে।

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *