হিটলারের জার্মানির অস্ত্রেই কি ইজ়রায়েলের প্রথম যুদ্ধজয়?
যে নাৎজ়ি শাসন ইউরোপের ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করার ভয়াবহ পরিকল্পনা নিয়েছিল, কয়েক বছর পর সেই শাসনের তৈরি অস্ত্রই হয়ে উঠেছিল ইহুদি রাষ্ট্র ইজ়রায়েলের আত্মরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ইতিহাসের এই অদ্ভুত পরিহাসের সূত্রপাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ১৯৪৮ সালে ইজ়রায়েলের স্বাধীনতার পর প্রথম আরব-ইজ়রায়েল যুদ্ধে অস্ত্রের ঘাটতি মেটাতে চেকোস্লোভাকিয়া থেকে গোপনে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছিল ইহুদি বাহিনী।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎজ়ি জার্মানি চেকোস্লোভাকিয়ার শিল্প পরিকাঠামোকে নিজেদের যুদ্ধযন্ত্রের কাজে লাগিয়েছিল। রাইফেল, মেশিনগান, ট্যাঙ্ক এবং যুদ্ধবিমানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য সেখানকার কারখানাগুলির ব্যবহার করা হত। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে সেই অস্ত্রভান্ডারের একটি বড় অংশ চেকোস্লোভাকিয়ার হাতে থেকে যায়।
ঠিক তখনই অস্ত্রের সন্ধানে মরিয়া হয়ে ওঠে ইহুদি নেতৃত্ব। ১৯৪৮ সালে নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রাক্কালে তাদের হাতে পর্যাপ্ত ভারী অস্ত্র বা আধুনিক বিমান ছিল না। পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছিল পশ্চিমা দেশগুলির অস্ত্র সরবরাহের বিধিনিষেধ। ফলে বিকল্প পথ খুঁজতে হয় ডেভিড বেন-গুরিয়নের নেতৃত্বাধীন ইহুদি নেতৃত্বকে।
চেকোস্লোভাকিয়ার সঙ্গে গোপন অস্ত্রচুক্তিই সেই সময় বড় সুযোগ এনে দেয়। বিপুল অর্থের বিনিময়ে জার্মান আমলের অস্ত্র এবং স্থানীয় ভাবে তৈরি সামরিক সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অস্ত্র পরিবহণের ক্ষেত্রেও ছিল চরম গোপনীয়তা। সরকারি নথিতে এক জায়গায় অস্ত্র অন্য দেশে পাঠানোর কথা দেখানো হলেও বাস্তবে সেগুলি পৌঁছনোর কথা ছিল ইহুদি বাহিনীর হাতে।
এই গোপন অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন বালাক’। সমুদ্র ও আকাশপথে অস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার জন্য একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বিমানপথে পরিবহণের জন্য মালবাহী বিমান ব্যবহার করা হয়। সমুদ্রপথে খাদ্যসামগ্রীর আড়ালেও অস্ত্র পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
এই অভিযানের ফলে ইহুদি বাহিনীর হাতে পৌঁছয় বিপুল সংখ্যক রাইফেল ও মেশিনগান। পাশাপাশি চেকোস্লোভাকিয়ার তৈরি অ্যাভিয়া এস-১৯৯ যুদ্ধবিমানও সংগ্রহ করা হয়েছিল। বিমানগুলি ইজ়রায়েলের সদ্য গড়ে ওঠা বিমানবাহিনীর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৪৮ সালের ১৫ মে ইজ়রায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই মিশর, জর্ডন, সিরিয়া, লেবানন ও ইরাকের বাহিনী যুদ্ধে নামে। সদ্যোজাত রাষ্ট্রটির সামরিক সক্ষমতা তখন তুলনামূলক ভাবে সীমিত। প্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত সেনার ঘাটতিও ছিল।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশ থেকে গোপনে আনা অস্ত্র ইজ়রায়েলি বাহিনীকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো শক্তি জোগায়। বিশেষ করে যুদ্ধবিমানগুলি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্যবহার করা হয়। এর ফলে ইজ়রায়েলি বাহিনীর প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং যুদ্ধের গতিপথও ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে।
তবে ১৯৪৮-এর যুদ্ধকে শুধুমাত্র চেকোস্লোভাকিয়া থেকে পাওয়া জার্মান অস্ত্রের ফল হিসেবে দেখলে ইতিহাসের ছবিটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। স্থানীয় বাহিনীর সংগঠন, জনবল, যুদ্ধকৌশল, বিদেশি স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে অস্ত্র সরবরাহ— সব মিলিয়েই ইজ়রায়েল টিকে থাকার লড়াই চালায়।
পরবর্তী দশকগুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজ়রায়েলের অন্যতম প্রধান সামরিক সহযোগী হয়ে ওঠে। কিন্তু রাষ্ট্রটির জন্মলগ্নের ইতিহাসে চেকোস্লোভাকিয়ার সেই গোপন অস্ত্র সরবরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস তাই এখানেই— ইহুদিদের নিপীড়নে ব্যবহৃত নাৎজ়ি জার্মানির যুদ্ধশিল্প থেকে তৈরি কিছু অস্ত্রই কয়েক বছর পর ইহুদি রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার লড়াইয়ে ব্যবহৃত হয়েছিল।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।