শিবাজির পরিবর্তে শশাঙ্ক!
বাংলার ইতিহাসে এক নতুন মোড়! পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিসরে ছত্রপতি শিবাজির পরিবর্তে গৌড়াধিপতি শশাঙ্ককে তুলে ধরার প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জাতীয় রাজনীতিতে শিবাজি ‘হিন্দু হৃদয়সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত হলেও, বাংলায় তাঁকে নিয়ে তেমন আবেগ গড়ে ওঠেনি। বরং, বাংলার নিজস্ব এক ‘হিন্দু বীর’ খুঁজে পেতে বিজেপি ও আরএসএস (RSS) নতুন করে শশাঙ্ককে প্রচারের আলোয় আনতে চাইছে।
আগামী বাংলা নববর্ষের আগেই শশাঙ্কের প্রথম পূর্ণাবয়ব মূর্তি উন্মোচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার মনে করছে, বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী অনুভূতি জাগাতে শশাঙ্কের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন।
কেন শিবাজির পরিবর্তে শশাঙ্ক?
শিবাজি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতীক হলেও, বাংলার ইতিহাসে তাঁকে নিয়ে তেমন আবেগ গড়ে ওঠেনি। বাঙালির মধ্যে শিবাজির তুলনায় ‘বর্গি-আতঙ্ক’ বেশি প্রচলিত, যা বিজেপির জন্য একটি বড় বাধা। তাই বিকল্প হিসেবে গৌড়ের রাজা শশাঙ্ককে ‘বাঙালি হিন্দু রাজা’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।
🔸 শশাঙ্ক ছিলেন ঘোষিত শৈব উপাসক, শিবাজিও তাই ছিলেন।
🔸 শিবাজি যেমন মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, তেমনই শশাঙ্ক বৌদ্ধ প্রভাবের বিরুদ্ধে হিন্দু শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
🔸 পাল সাম্রাজ্য ছিল বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক, সেন বংশ দক্ষিণ ভারতীয়। তাই একাধারে ‘বাঙালি’ ও ‘হিন্দু’ শাসক হিসেবে শশাঙ্কই একমাত্র প্রতীক।
শশাঙ্ককে নিয়ে বিজেপির নতুন হিসাব
গত কয়েক বছর ধরে বিজেপি-আরএসএস শশাঙ্ককে বঙ্গাব্দের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন, বঙ্গাব্দের সূচনা আকবরের আমলে হয়েছিল। তবে বিজেপি-আরএসএস দাবি করছে, ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে শশাঙ্কের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকেই বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয়েছিল।
🟠 যদি আকবর ১৫৫৬ সালে বঙ্গাব্দ শুরু করেন, তবে এখন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ হওয়া সম্ভব নয়— এই অঙ্ককেই হাতিয়ার করে বিজেপি ইতিহাসের নতুন ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
শশাঙ্কের মূর্তি ও ছবি তৈরির উদ্যোগ
শশাঙ্কের ঐতিহাসিক কোনো মূর্তি বা ছবি নেই। কিন্তু বিজেপি ও আরএসএস সংগঠিতভাবে তাঁর খড়্গধারী কাল্পনিক ছবি তৈরি করেছে এবং তা সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে।
✅ আর্ট কলেজের ছাত্রদের দিয়ে শশাঙ্কের ছবি আঁকানো হয়েছে
✅ ‘সংস্কার ভারতী’ প্রতিবছর নববর্ষে শশাঙ্কের ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার প্রকাশ করছে
✅ এবার প্রথমবারের মতো পূর্ণাবয়ব মূর্তি উন্মোচিত হতে চলেছে
আগামী ৮ এপ্রিল জাতীয় গ্রন্থাগারে ‘নববর্ষ আবাহন’ অনুষ্ঠানে শশাঙ্কের মূর্তি উন্মোচন করা হবে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বিজেপি সরাসরি স্বীকার না করলেও, শশাঙ্ককে প্রচারের মাধ্যমে তারা বাংলার রাজনৈতিক আবেগকে ‘হিন্দুত্ববাদী’ রূপ দিতে চাইছে।
🟠 রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, শিবাজিকে নিয়ে বামপন্থীদের বিরোধিতা থাকলেও শশাঙ্ক বাংলার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
🟠 আরএসএস মনে করে, শশাঙ্কের বীরত্ব তুলে ধরলে বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে ঐতিহাসিক আত্মপরিচয় আরও দৃঢ় হবে।
শেষ কথা
বিজেপির লক্ষ্য বাংলায় হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভিত্তি শক্ত করা। এক্ষেত্রে শিবাজির পরিবর্তে শশাঙ্ককে প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে তারা। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ‘নতুন হিন্দু আইকন’ তৈরির প্রচেষ্টা আরও তীব্র হবে। শশাঙ্ককে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি হতে পারে— যা আগামী দিনগুলিতে বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পের ‘পাল্টা শুল্ক’ ঘোষণার অপেক্ষায় বিশ্ব, ভারতের চিন্তা বাড়ছে!