রাজ্যে লগ্নি প্রস্তাবের বাস্তবায়নে ফারাক বিশাল!
পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও বাণিজ্য খাতে গত কয়েক বছর ধরে যে লগ্নি প্রস্তাব এসেছে, তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট ধীরগতি দেখা দিয়েছে, এমন দাবি বহুদিন ধরেই করে আসছেন বিরোধী দল এবং শিল্পমহল। যদিও রাজ্য সরকার বারবার এই অভিযোগ নাকচ করে এসেছে, তবে সম্প্রতি প্রকাশিত শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রকের সর্বশেষ রিপোর্টটি পরিস্থিতির একটি নতুন ছবি তুলে ধরেছে।
গত বছর জানুয়ারি-জুলাইয়ের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে যে ২০,৯০০ কোটি টাকার লগ্নি প্রস্তাব এসেছে, তার মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ২২৫৬ কোটি টাকা, যা মোট প্রস্তাবের দশ ভাগের মাত্র এক ভাগ। এই রিপোর্টটি শিল্প দুনিয়া এবং রাজ্য সরকারের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় কিছুটা উন্নতি করেছে। ২০২৩ সালে এই সময়কালে মাত্র ১২০০ কোটি টাকার ১৪টি প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়েছিল, যা গত বছরের ২৭টি প্রকল্পের তুলনায় বেশি হলেও, প্রকল্প বাস্তবায়ন এখনও পর্যাপ্ত নয়।
দেশের মধ্যে রাজ্যের স্থান
প্রকল্প বাস্তবায়নের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে সপ্তম স্থানে রয়েছে, তবে সেখানে একটি বিশাল ফারাক আছে। শীর্ষে রয়েছে মহারাষ্ট্র, যেখানে সাত মাসে ১৫৮টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এর পরেই রয়েছে গুজরাত (১২৫), মধ্যপ্রদেশ (৭৪), উত্তরপ্রদেশ (৫৪), অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ু। পশ্চিমবঙ্গের পরে ২৬টি প্রকল্প নিয়ে অষ্টম স্থানে রয়েছে কর্নাটক, রাজস্থান এবং ওড়িশা।
ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বেশি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, মোট আটটি, যার লগ্নি ছিল ৬৮৫ কোটি টাকা এবং এতে কর্মসংস্থান হয়েছিল প্রায় ১৫০০। কিন্তু, গত বছর চলাকালীন সময়ে দেখা যায় যে অনেক প্রকল্পে বাস্তবায়নের গতি ধীর ছিল।

শিল্প মহলের মন্তব্য
শিল্পমহলের বক্তব্য, বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলির বেশিরভাগই গত বছরের আগেই প্রস্তাবিত হয়েছিল। ২০২৪ সালে যে প্রকল্পগুলি এসেছে, সেগুলির বাস্তবায়ন হতে এক বা দুই বছর সময় লাগতে পারে। রাজ্যের এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিল্পকর্তা বলেন, “সরকার লগ্নি টানতে সফল দাবি করলেও, এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে বাংলায় শিল্পের পরিস্থিতি তেমন ভালো নয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে রাজ্য কখনই মুখ খোলেনি। কেন্দ্রের তথ্যে সেটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।”
অন্যদিকে, বণিকসভা মার্চেন্টস চেম্বারের বক্তব্য, রাজ্যে শিল্পের পরিস্থিতি ইতিবাচক এবং লগ্নির দায় সরাসরি সংস্থাগুলির উপরে বর্তায়। তাদের দাবি, সংস্থাগুলির গাফিলতি খতিয়ে দেখা উচিত।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশ্বখ্যাত শিল্প বিশেষজ্ঞ সুপর্ণ মৈত্রও বলছেন, “রাজ্যের একার দোষ নয়। কারণ রাজ্য সরকার শিল্পপতিদের কাছ থেকে প্রস্তাবের তথ্য নেয় এবং সেই অনুযায়ী কেন্দ্রকে জানায়। কিন্তু যখন শিল্পপতিরা নিজেরাই তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন না, তখন রাজ্যের পক্ষে কিছুই করার থাকে না।”
তিনি আরও বলেন, “রাজ্য সাধারণত বড় লগ্নি প্রস্তাবকেই তুলে ধরে। কিন্তু কতটা বাস্তবে আসে, সেই প্রশ্নটি থেকেই যায়। কেন্দ্রের তথ্য এই বিরোধকে অনেকটা পরিষ্কার করেছে।”
উপসংহার
রাজ্যে লগ্নি প্রস্তাবের বাস্তবায়নে এমন বিস্তর ফারাক দেখানো সরকারি রিপোর্ট রাজ্য সরকারের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পমহল এবং বিরোধীরা এই পরিস্থিতির গভীরে গিয়ে আরও তদন্ত এবং সংশোধন দাবি করছেন, যাতে ভবিষ্যতে প্রকল্প বাস্তবায়নে ত্বরান্বিত গতি আনতে পারে রাজ্য।