মন্দারমণিতে হোটেল নির্মাণ
কিছু দশক আগেও মন্দারমণি ছিল পূর্ব মেদিনীপুরের এক শান্ত, মনোরম সৈকত। বিশাল ধু-ধু বালিয়াড়ি, কেয়াঘাসের জঙ্গল আর লাল কাঁকড়ায় ভরা এই এলাকা প্রকৃতি প্রেমীদের স্বর্গরাজ্য ছিল। দিঘার কোলাহল থেকে দূরে, এখানে পর্যটকেরা খুঁজে পেতেন নিভৃতির পরশ। তবে এই চিত্র এখন অতীত।
গত দুই দশকে মন্দারমণির পরিবেশ ও চেহারায় নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। সৈকতের ধারে গড়ে উঠেছে শতাধিক হোটেল। এই ব্যবসা আর্থিক সমৃদ্ধি আনলেও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। লাল কাঁকড়ার অস্তিত্ব সংকটে, বালিয়াড়ি ধ্বংসের মুখে, আর সমুদ্রও ক্রমশ এগিয়ে আসছে।
‘অবৈধ’ হোটেলের সংখ্যা বৃদ্ধি
বর্তমানে মন্দারমণিতে প্রায় ১৪০টি হোটেল ও লজকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরিবেশ আদালতের নির্দেশে এগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তবে এমন পরিস্থিতিতেও, নতুন প্রায় ১০০টি নির্মাণ কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে অনেক হোটেলের কাজ শেষ পর্যায়ে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, মন্দারমণি ও এর আশপাশের প্রায় ছ’টি মৌজায় এমন নির্মাণ চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, সিআরজেড (কোস্টাল রেগুলেটেড জ়োন) নিয়ম না মেনে এসব হোটেল তৈরি হচ্ছে। বোল্ডার দিয়ে সমুদ্র রক্ষা করার চেষ্টা চলছে, কিন্তু এতে বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি প্রায় উধাও হয়ে যাচ্ছে।
পরিবেশ সংকট
মন্দারমণির স্থানীয় মৎস্যখটির সম্পাদক শ্রীকান্ত দাস জানিয়েছেন, সমুদ্র গত কয়েক বছরে প্রায় ২৫০ মিটার এগিয়ে এসেছে। ভরা কোটালের সময় অনেক হোটেল চত্বর পানিতে ডুবে যায়। এ ছাড়াও, আশপাশের গ্রামগুলোর বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
হোটেল শিল্পের সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ
স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। হোটেল ব্যবসা মন্দারমণির আর্থিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখলেও, পরিবেশ ধ্বংসের বিষয়টি এড়ানো সম্ভব নয়। হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মীর মমরেজ আলি মনে করেন, সিআরজেড এলাকা সঠিকভাবে চিহ্নিত না করাই সমস্যার মূল কারণ।
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নতুন হোটেল নির্মাণের কারণে পরিবেশের উপর প্রভাব আরও বেড়েছে। আইন অনুসারে কাজ করা হয়নি বলেও অভিযোগ।
ভবিষ্যৎ
এই পরিস্থিতিতে মন্দারমণির টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আইন মেনে হোটেল ব্যবসা পরিচালনা জরুরি। একদিকে যেমন হোটেল শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে পরিবেশ ধ্বংস এবং সামাজিক সংকট তৈরি করছে। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, তাহলে মন্দারমণির প্রকৃতি ও অর্থনীতি দুটোই রক্ষা করা সম্ভব।
পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পর্যটনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মন্দারমণির ভবিষ্যৎ এ টানাপোড়েন থেকেই নির্ধারিত হবে।