কুমারীত্ব পরীক্ষা বাধ্যতামূলক নয়!
নারীর মর্যাদা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার রক্ষার পক্ষে ঐতিহাসিক রায় দিল ছত্তীসগড় হাই কোর্ট। সম্প্রতি এক মামলায় আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল, কোনও নারীকে জোর করে কুমারীত্ব পরীক্ষার বাধ্য করা যাবে না। সংবিধানের ২১তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি নারীর জীবন ও স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেন বিচারপতি অরবিন্দ কুমার বর্মা।
কী ছিল এই মামলার পটভূমি?
২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল ছত্তীসগড়ের কোরবা জেলার এক দম্পতির বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর স্ত্রী অভিযোগ করেন যে, তাঁর স্বামী পুরুষত্বহীন এবং বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে অক্ষম। এরপর ২০২৪ সালের ২ জুলাই তিনি আদালতে ২০,০০০ টাকা মাসিক ভরণপোষণের আবেদন করেন।
তবে পাল্টা অভিযোগ তুলে স্বামী দাবি করেন, তাঁর স্ত্রীর দেওরের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই তথ্য গোপন করতেই তিনি এই অভিযোগ তুলেছেন। এরপরই স্বামী আদালতে স্ত্রীর কুমারীত্ব পরীক্ষার আবেদন জানান, যা পারিবারিক আদালত খারিজ করে দেয়। পরে তিনি হাই কোর্টে আবেদন করেন, কিন্তু সেখানেও তাঁর আবেদন খারিজ হয়ে যায়।
হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ কী?
ছত্তীসগড় হাই কোর্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছে, একজন নারীকে তাঁর কুমারীত্বের প্রমাণ দিতে বাধ্য করা যাবে না। আদালত বলেন, “সংবিধানের ২১তম অনুচ্ছেদ শুধু জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার দেয় না, বরং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারও নিশ্চিত করে। নারীর জন্য এই অধিকার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”
বিচারপতি আরও বলেন, “কোনও পরিস্থিতিতেই নারীর কুমারীত্ব পরীক্ষা করানোর অনুমতি দেওয়া যাবে না। এটি ন্যায়বিচারের মূল নীতি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে।”
পুরুষত্বহীনতার প্রমাণ কীভাবে দেওয়া সম্ভব?
আদালত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, স্বামী যদি প্রমাণ করতে চান যে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভিত্তিহীন, তাহলে তিনি নিজেই ডাক্তারি পরীক্ষা করিয়ে সেই তথ্য আদালতে পেশ করতে পারেন। কুমারীত্ব পরীক্ষা করানো কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
নারীর সম্মান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ রায়
এই রায় শুধু এই মামলার ক্ষেত্রেই নয়, ভারতের নারীদের অধিকার রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। অতীতে বিভিন্ন সময় নারীদের অযাচিত শারীরিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা তাঁদের ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত হানে। হাই কোর্টের এই রায় ভবিষ্যতে নারীদের আইনি সুরক্ষাকে আরও জোরদার করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নারীদের বিরুদ্ধে কুমারীত্ব পরীক্ষার বিতর্কিত প্রচলন
ভারতে বহু বছর ধরে কিছু সম্প্রদায় ও সমাজে বিয়ের আগে বা পরে নারীদের কুমারীত্ব পরীক্ষার কুসংস্কার চালু ছিল। যদিও আধুনিক সমাজে এটি অসাংবিধানিক ও অমানবিক বলে গণ্য করা হয়।
এর আগেও ভারতের বিভিন্ন আদালত এই ধরনের পরীক্ষাকে লিঙ্গবৈষম্যমূলক, অবৈধ ও অপমানজনক বলে ঘোষণা করেছে। তবে ছত্তীসগড় হাই কোর্টের এই রায় আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে নারীর মর্যাদাকে রক্ষার স্বপক্ষে দাঁড়িয়েছে।
শেষ কথা
কোনও নারীকে জোর করে কুমারীত্ব পরীক্ষার বাধ্য করা শুধু অপমানজনক নয়, এটি তাঁর মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। ছত্তীসগড় হাই কোর্টের এই রায় সমাজে নারীর মর্যাদাকে আরও সুসংহত করবে এবং নারীর বিরুদ্ধে অযাচিত ও বৈষম্যমূলক নিয়মের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা দেবে।
প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জে ভূমিকম্পের তাণ্ডব! সুনামির আশঙ্কা