নাদিয়ালে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ
কলকাতার বন্দর এলাকার নাদিয়ালের ফকিরপাড়া জামা মসজিদে দেখা গেল এক অবাক করা দৃশ্য। সেখানে রমজান মাসের শেষ জুম্মার নামাজের পর একদিকে যেমন মুসলিম রোজাদাররা গোলাপ ফুল হাতে নিয়ে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলেন, তেমনই অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছিলেন। সম্প্রীতির এক অপরূপ নিদর্শন ছিল এই মুহূর্তে, যা শুধু চোখের সামনে নয়, হৃদয়েও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
নাদিয়াল, কলকাতা পুরসভার ১৪১ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত একটি শান্তিপূর্ণ এলাকা, যেখানে হিন্দু-মুসলিম বাসিন্দাদের মধ্যে দারুণ সম্প্রীতি রয়েছে। কয়েক বছর আগে এখানকার বাসিন্দারা শান্তি রক্ষা কমিটি বা ‘পিস কমিটি’ গঠন করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল দুর্গাপুজো, মহরম, কুরবানি ও ইদসহ অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে শান্তি এবং সৌহার্দ্যের বার্তা প্রচার করা। এই কমিটির সদস্যরা তাদের জীবনে প্রমাণ করেছেন, ধর্মীয় ভেদাভেদকে দূরে রেখে, একে অপরকে সম্মান জানিয়ে সহাবস্থান করা সম্ভব।
ফকিরপাড়া জামা মসজিদের সামনে, জুম্মার নামাজ শেষে রুদ্রেন্দু পাল, বীরবল গিরি, সুরজিৎ অধিকারী, অশোক কর্মকার—এদের মতো হিন্দু বাসিন্দারা গোলাপ ফুল হাতে তুলে দিচ্ছিলেন মুসলিম রোজাদারদের। একে অপরকে কোলাকুলি করে, যেন তারা এক পরিবারের সদস্য। রুদ্রেন্দু পাল বলেন, ‘‘কবি বলেছেন, ‘আয়, আরও বেঁধে বেঁধে থাকি।’ আমাদের এখানে দুর্গাপুজো, ইদ, কুরবানি, মহরম—সব কিছুতে আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়াই। ধর্মীয় কোনো বাধাই আমাদের বাঁধতে পারবে না।’’
কমিটির আরেক যুগ্ম সম্পাদক মহম্মদ ওয়ারিশ বলেন, ‘‘আজকাল কিছু রাজনৈতিক দল হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের নীতিতে বিশ্বাসী, কিন্তু আমরা নাদিয়ালের হিন্দু-মুসলিম বাসিন্দারা একে অপরকে সহ্য করি, শ্রদ্ধা করি এবং পাশে দাঁড়াই।’’
এলাকার বাসিন্দা অসিতরঞ্জন জোয়ারদার বলেন, ‘‘গোলাপ হলো ভালবাসার ফুল, আর নাদিয়ালে এই ভালবাসা অটুট রাখতেই গোলাপ বিতরণের এই আয়োজন।’’
এই উদ্যোগের আরও একটি অংশ ছিল, শনিবার শান্তি কমিটি এলাকার দুঃস্থ মুসলিমদের হাতে উপহার হিসাবে সিমুই, আটা, তেল, চিনি এবং দেশি মুরগি তুলে দেয়। এসবই ছিল তাদের সহযোগিতা ও প্রেমের নিদর্শন।
নাদিয়াল থানার ওসি সৌমেন বন্দ্যোপাধ্যায় এ বিষয়টি নিয়ে বলেন, ‘‘এটা কোনো লোক দেখানো সম্প্রীতি নয়। এখানে সারা বছর ধরে দুই সম্প্রদায় একে অপরের পাশে থাকে। এটা আমাদের দেশের আসল ছবি—যতদিন আমরা একে অপরকে সম্মান করব, ততদিন আমাদের সমাজে শান্তি বজায় থাকবে।’’
আজ, সোমবার, খুশির ইদ। রমজান মাসের শেষ লগ্নে হাজি শেখ জুম্মান হোসেন তার চোখে জল নিয়ে বলেন, ‘‘ধর্মীয় ভেদাভেদ নয়, আমরা চাই সারা পৃথিবীতে সব ধর্মের মানুষ এমন ভাবে বাঁচুন, যেমন আমরা এখানে বাঁচি।’’
নাদিয়ালে এই দৃশ্য একটি প্রমাণ—ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ঐক্য শুধুমাত্র সম্ভবনা নয়, বরং আমাদের সবার কাজ করার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে।
প্রেমের ইঙ্গিত না গোপন বার্তা? দেবচন্দ্রিমার ‘জিবলি’ ছবিতে রহস্যময় প্রেমিক!