স্তন ক্যানসার নির্ণয়ে নতুন পোর্টেবল যন্ত্র
দেশজুড়ে মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর এই রোগের দ্রুত চিহ্নিতকরণ ও চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক স্তরে চিকিৎসা শুরু করলে মৃত্যুর হার অনেক কমানো সম্ভব, তাই সময়মতো রোগ চিহ্নিত করার জন্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পোর্টেবল আলট্রাসাউন্ড ডিভাইসের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেছে, যা স্তন ক্যানসার চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহৃত হবে। এই পরীক্ষামূলক ট্রায়ালের জন্য কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
পোর্টেবল আলট্রাসাউন্ড ডিভাইসটি একটি ছ’ইঞ্চির ছোট যন্ত্র, যা মোবাইল বা ট্যাবের সঙ্গে সংযুক্ত করা যাবে। এর মাধ্যমে যে কোনও জায়গায় স্তন ক্যানসার চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এই যন্ত্রের সাহায্যে শহর এবং গ্রামাঞ্চলে মহিলাদের স্তনে টিউমার থাকলে তা ক্যানসার কিনা সহজেই বোঝা যাবে। এই প্রযুক্তি মূলত মহিলাদের জন্য একটি কার্যকর এবং সহজ উপায় হবে, যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে রোগ চিহ্নিত করা সম্ভব।
পিজি-র স্তন ক্যানসার শল্য চিকিৎসক দীপ্তেন্দ্র সরকার জানিয়েছেন, এই যন্ত্রটি ব্যবহার করতে বিশেষজ্ঞ রেডিয়োলজিস্টের প্রয়োজন হবে না। অন্যান্য চিকিৎসকরাও প্রশিক্ষণ নিয়ে যন্ত্রটি ব্যবহার করতে পারবেন। তিনি জানান, ‘‘অন্য চিকিৎসকদের দিয়েও স্তন ক্যানসার চিহ্নিত করা সম্ভব। তাই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হিসেবে পিজি-কে বেছে নেওয়া হয়েছে।’’
এটি একটি বড় পদক্ষেপ, কারণ এই যন্ত্রটির মাধ্যমে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মহিলাদের স্তন ক্যানসার নির্ণয়ে নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। একদিকে যেমন শহরাঞ্চলে ব্যবহৃত হবে, অন্যদিকে গ্রামে গিয়েও শিবিরে এই যন্ত্রের মাধ্যমে মহিলাদের স্তনে ক্যানসার বা টিউমার থাকলে তা সহজেই চিহ্নিত করা যাবে। এর ফলে ক্যানসার চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এবং সাশ্রয়ী হবে।
এই পরীক্ষামূলক গবেষণা নিয়ে দীপ্তেন্দ্র সরকার এবং পার্থ বসু, দু’জন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। তারা এই প্রযুক্তি রাজ্যে নিয়ে আসেন এবং ১৩ মাস ধরে বিভিন্ন অনুমোদন পেয়ে, শেষে পিজি-কে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের চূড়ান্ত অনুমতি দেওয়া হয়। যন্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে পিজি-সহ অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজগুলোকেও, যেমন ডায়মন্ড হারবার মেডিক্যাল কলেজ, এম আর বাঙুর হাসপাতাল এবং ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ।
ডিভাইসটি ব্যবহারের পর, পরীক্ষা করা তথ্য একটি নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোড হবে। এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সময়, পরীক্ষার গুণগত মান বজায় রাখার জন্য ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার নজর রাখবে। এছাড়া, কত শতাংশ চিকিৎসক রেডিয়োলজিস্ট না হয়েও এই যন্ত্রের মাধ্যমে ক্যানসার নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছেন, তাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যালোচনায় থাকবে। এই গবেষণা ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত চলবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পরীক্ষামূলক গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করে ২০২৫ সালে যন্ত্রটির ব্যবহার এবং স্তন ক্যানসার নির্ণয়ে এর কার্যকারিতা প্রকাশ করবে। গবেষণার ফলাফলে যদি এটি সফল প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি সারা বিশ্বে স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিপ্লব আনবে। মহিলাদের মধ্যে এই ধরনের ক্যানসারের প্রচারের হার কমানোর জন্য এমন প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সহজেই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
এই পরীক্ষামূলক ট্রায়ালের মাধ্যমে স্তন ক্যানসার চিহ্নিত করার পদ্ধতি আরও দ্রুত এবং কার্যকরী হতে চলেছে। এর মাধ্যমে চিকিৎসা খরচ কমানোর পাশাপাশি, দ্রুত সময়ে ক্যানসার নির্ণয়ের ফলে রোগীরা সময়মতো চিকিৎসা পাবে। এই যন্ত্রটি স্তন ক্যানসার নির্ণয়ের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হতে পারে, যা দেশজুড়ে মহিলাদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠবে।
এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে, ভবিষ্যতে সাধারণ চিকিৎসকরাও বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে গিয়েও এই যন্ত্র ব্যবহার করতে পারবেন, এবং স্তন ক্যানসারের মতো গুরুতর রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে সক্ষম হবেন।

