Monday, December 8, 2025

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের নতুন অধ্যায়: আলেপ্পো দখল, রাশিয়ার বিমানহানা এবং বাইডেনের বিদায়ী নীতির প্রভাব

Share

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের নতুন অধ্যায়

সিরিয়ার মাটিতে নতুন করে রক্ত ঝরছে। বিদ্রোহীদের হাতে আলেপ্পো শহর দখল হয়ে যাওয়ার পর রাশিয়ার শক্তিশালী বিমানহানা গোটা বিশ্বকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। পশ্চিম এশিয়ার এই সংকট যে সহজে থামবে না, তা আবারও প্রমাণিত হলো। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির সংঘাতের মধ্যেই বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আলেপ্পোতে রুশ বিমানহানা: কী ঘটেছে?

সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পো বিদ্রোহীদের দখলে যেতেই রুশ বিমান বাহিনী সেখানে হামলা চালায়। মস্কো সরাসরি এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। আলেপ্পো দখলের পর রাশিয়ার এমন হস্তক্ষেপ ২০১৬ সালের পর এবারই প্রথম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হামলা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধকে আরও ভয়ঙ্কর পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

আলেপ্পোতে বিদ্রোহীদের প্রধান গোষ্ঠী ‘হায়াত তাহরির আল-শাম’ (এইচটিএস) এবং তাদের সহযোগী ‘জইশ আল-ইজ্জা’। নভেম্বরে বিদ্রোহীরা প্রবল শক্তি নিয়ে আক্রমণ চালায়। আসাদের সেনা তাদের ঠেকানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে, আর এই সুযোগে রাশিয়া আসাদ বাহিনীকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

রাশিয়ার হস্তক্ষেপের কারণ

বাশার আল আসাদের সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক রয়েছে। আসাদকে ক্ষমতায় রাখা রাশিয়ার জন্য কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, সিরিয়ার ভূখণ্ডে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে মস্কো আসাদকে সমর্থন করে এসেছে। কিন্তু হঠাৎ করে এই হামলা কেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া চায় না বিদ্রোহীদের হাতে সিরিয়ার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলি চলে যাক।

বিদ্রোহীদের সাফল্য এবং আসাদ বাহিনীর পরাজয়

আলেপ্পোর দখল নেওয়ার পর বিদ্রোহীরা শহরজুড়ে বিজয় উদযাপন করে। প্রেসিডেন্ট আসাদের প্রয়াত ভাই বাসিল আল-আসাদের মূর্তি ভেঙে সেখানে অস্ত্র হাতে পোজ দিয়েছে বিদ্রোহীরা। সিরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ৪৮ ঘণ্টার টানা সংঘর্ষেও শহর রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বিদ্রোহীদের আক্রমণে সরকারি সেনা ছাড়াও অসংখ্য বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা

রাশিয়ার বিমানহানা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আলেপ্পোর কৌশলগত অবস্থান আসাদ বাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শহর বিদ্রোহীদের হাতে যাওয়ায় উত্তরাঞ্চলে আসাদের সেনা দুর্বল হয়ে পড়েছে। মস্কো এখন আলেপ্পো পুনর্দখলের জন্য নতুন পরিকল্পনা করছে।

এদিকে, তুরস্কের মদতপুষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি ইদলিব থেকে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু করেছে। এ নিয়ে রুশ এবং তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে শান্তি ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই।

বাইডেন প্রশাসনের বিদায়ী নীতি ও নতুন প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, বিদ্রোহীদের পেছনে বাইডেন প্রশাসনের সমর্থন বড় ভূমিকা পালন করেছে। আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য বাইডেন প্রশাসন কৌশলে বিদ্রোহীদের সাহায্য করেছে। বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সাফল্যের নেপথ্যে বাইডেনের নীতিই কি তাহলে কাজ করেছে?

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এর আগেও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প সিরিয়া থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিতে পারেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু বিদ্রোহীদের এই অগ্রগতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ব রাজনীতির পরবর্তী পদক্ষেপ

সিরিয়ার পরিস্থিতি গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। একদিকে রাশিয়া এবং আসাদের মিত্র ইরান, অন্যদিকে বিদ্রোহীদের পেছনে থাকা তুরস্ক, ইজরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। আলেপ্পোর এই সংঘাত যে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে, আলেপ্পোর পুনর্দখল কি সম্ভব? বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সাফল্য এবং আসাদ বাহিনীর দুর্বলতার প্রেক্ষিতে তা কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে রাশিয়া যেভাবে পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করেছে, তাতে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। পশ্চিম এশিয়ার এই সংকট কত দ্রুত সমাধান হবে, তা এখন সময়ই বলবে।

Read more

Local News