বিজেপির ‘লুজ় ক্যানন’ কি এবার নিজের দলেই বিস্ফোরণ?
কেউ বলেন ‘অধৈর্য যোদ্ধা’, কেউ বা বলেন ‘ব্রহ্মতেজে সিক্ত’। কিন্তু বিজেপি সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কে আজ বোধহয় সবচেয়ে মানায় একটি তকমা— ‘লুজ় ক্যানন’। যিনি কখন কোথায় তোপ দাগাবেন, আগাম হিসেব মেলানো কঠিন।
লোকসভা ভোটের মাঝে পূর্ব মেদিনীপুরের রামতারক এলাকার এক গ্রামীণ হোটেলে তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। মহাসড়কের ধারে নিস্তব্ধ সেই দ্বিতীয় তলার ঘরে এক কোণে আলুথালু কবিতার বই, পলিথিনের প্যাকেটে সাদা কুর্তা, আর… বিছানার উপর শ্বেতচাদরে ঢাকা ভারতের সংবিধান যেন এক নিঃশব্দ ঘোষণা— এই মানুষটি রাজনৈতিক মঞ্চে এলেও মস্তিষ্কে বিচারপতির আসন ছাড়তে প্রস্তুত নন।
সেদিনই মনে হয়েছিল, তিনি বিজেপিতে যোগ দিলেও দলীয় শৃঙ্খলের খাঁচায় পাখি হতে পারবেন না।
কেন ‘লুজ় ক্যানন’?
কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দুর্নীতিতে তাঁর একের পর এক রায়, শাসকদলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান— তাঁকে সাধারণ মানুষের মাঝে ‘ন্যায়বিচারের প্রতিমা’ বানিয়ে দিয়েছিল। রাজনীতিবিমুখ সমাজও তাঁকে দেখতে শুরু করেছিল এক নিষ্কলুষ নায়কের রূপে।
কিন্তু সেই গঙ্গোপাধ্যায় যখন রাজনীতির মাঠে নামলেন, নিজেই বললেন— “ব্রহ্মতেজ আছে, তাই রাগও আছে।”
আর এই ‘তেজ’ই এখন বিজেপির অন্দরেও ঢেউ তুলছে।
বিস্ফোরণের সময়টা গুরুত্বপূর্ণ
বিধানসভা ভোট দোরগোড়ায়। আর ঠিক তখনই তিনি সংবাদমাধ্যমে বলছেন—
“এখনই বলতে হবে। ভোট চলে এলে আর সুযোগ থাকবে না।”
“আমি আরও বলব।”
দল অসন্তুষ্ট হলে?
জবাব— “দল তো কিছু বলেনি, বললে দেখা যাবে।”
এই অস্বস্তিকর নিস্পৃহতাই তাঁকে বাকিদের থেকে আলাদা করে।
দল বদলের যাত্রা নাকি আদর্শের সন্ধান?
কলকাতা হাই কোর্টে আলাপের সময় জানিয়েছিলেন, বাম আদর্শে বিশ্বাসী। সিপিএম নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগও ছিল। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে বামেদের পতন টিকিট নিশ্চিত করতে পারে না, আর তৃণমূলকে ‘চ্যালেঞ্জ’ জানাতে বিজেপিই ছিল কার্যকর মঞ্চ।
তাঁকে বিজেপি–আরএসএসের সঙ্গে প্রথম সংযোগ করিয়ে দেন এক পরিচিত টিভি মুখ। এরপর শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে তাঁর তমলুক যাত্রা— এবং বিপুল ভোটে জয়। চারদিকে তখন গুঞ্জন— “উনি আইনমন্ত্রী হবেন!” যদিও বাস্তব তা ছিল না।
এখন কেন দলকে নিশানা?
আজ সেই অভিজিৎই বলছেন—
- “মমতাকে চাপে ফেলতে পারিনি, দায় কেন্দ্রের।”
- “ইডি–সিবিআই মাথা পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে না।”
- “সেটিং তত্ত্ব থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না।”
এই বক্তব্য শুধু বিরোধী আক্রমণ নয়, বরং নিজের দলের কৌশলের বিরুদ্ধেই এক বিচারকের অবিচল জেরা।
শেষ কথা
বিচারপতির কোর্টে তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য, রাজনীতির কোর্টে অননুমেয়।
তিনি চেয়েছেন ক্ষমতা নয়, প্রতিধ্বনি। চেয়েছেন সত্য বলার স্বাধীনতা— এমনকি তা নিজের শিবিরের বিরুদ্ধেও হলে।
তাই প্রশ্নটা এখন আর “অভিজিৎ বিজেপির সাথে মানানসই কি?” নয়, বরং—
👉 “বিজেপি কি অভিজিৎকে সামলাতে প্রস্তুত?”
কারণ, ইতিহাস বলছে— ‘লুজ় ক্যানন’ কখনও নীরব থাকে না। শুধু সময় দেখে গর্জায়।’

