বাঞ্ছারামের স্মৃতি
১৯৮০ সালের একটি কালজয়ী বাংলা ছবি, বাঞ্ছারামের বাগান, আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে অম্লান। পরিচালক তপন সিংহের এই সিনেমা মনোজ মিত্রের নাটক সাজানো বাগান-এর উপরে ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, যেখানে প্রধান চরিত্রে ছিলেন স্বয়ং মনোজ মিত্র। ছবির গল্পের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বৃদ্ধ বাঞ্ছারামের জীবন সংগ্রাম, আর তার শুটিং হয়েছিল দক্ষিণ ২৪ পরগণার বারুইপুরে অবস্থিত এক প্রাচীন আমবাগানে।
আজ প্রায় ৪৫ বছর পরেও, সেই বাগানের স্মৃতি বারুইপুরের শিখরবালি-১ পঞ্চায়েত এলাকায় একেবারে জীবন্ত। চক্রবর্তী পরিবারের আমবাগানটি এখনও ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ নামেই পরিচিত।
বাগানে শুটিংয়ের কাহিনি
এই বাগানটি সিনেমার শুটিংয়ের জন্য তপন সিংহকে প্রস্তাব করেছিলেন চক্রবর্তী পরিবারের এক আত্মীয়, যিনি সিনেমা জগতের সাথে পরিচিত ছিলেন। চক্রবর্তী পরিবারের বর্তমান সদস্য দীপক চক্রবর্তী, যিনি তখন মাত্র ১২-১৩ বছরের কিশোর ছিলেন, বলেন যে শুটিং চলাকালীন প্রায় এক মাস ধরে মনোজ মিত্র ও অন্যান্য কলাকুশলীরা বারুইপুরের একটি বাড়িতে থাকতেন।
দীপক চক্রবর্তী জানান, সেই সময়ের শুটিংয়ের কিছু স্মৃতি আজও মনে গেঁথে রয়েছে। শুটিং চলছিল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, আর মনোজ মিত্র অত্যন্ত আন্তরিকভাবে তার চরিত্রে ডুবে যেতেন।
বাগানটির অবস্থা আজও অপরিবর্তিত
আজও সেই বাগানটি অপরিবর্তিত রয়েছে। দীপক চক্রবর্তী বলেন, ‘‘বাগানে শীতকালীন বনভোজন বা শুটিং এখনো মাঝে মাঝে হয়, তবে এখানে পরিবেশ ও প্রকৃতির ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়।’’ বাগানে এখনও পুরনো আমগাছগুলি রয়েছে, যা সেই সময়ের সাক্ষী। গাছগাছালি, পাখ-পাখালি, এমনকি প্রাণীজগতের সুরক্ষা নিয়েও বাড়তি যত্ন নেওয়া হয়, যেন প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা বজায় থাকে।
গত কয়েক বছরে, মনোজ মিত্র এই বাগানে পুনরায় আসেন, একটি ছবির শুটিং করার জন্য। তার সঙ্গে ছিলেন দীপক চক্রবর্তী এবং তাঁর ছেলে দ্বৈপায়ন চক্রবর্তী। দ্বৈপায়ন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ‘‘মনোজ মিত্র প্রথম দিন বাগানে এসে শুটিং শুরু করেছিলেন ভোর ৪টায়। তিনি সেই সময়ের শুটিং স্মৃতি অত্যন্ত ভালোবাসায় তুলে ধরেছিলেন, বিশেষ করে একটি দৃশ্য—যতটা সম্ভব শীতল ভোরে পুকুর থেকে জল তোলার দৃশ্য।’’
মনোজ মিত্রের আবেগ
মনোজ মিত্র বাগানটি দেখে যে আনন্দিত হয়েছিলেন তা দ্বৈপায়ন আরও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘‘তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল, যেন তিনি তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা স্মৃতি ফিরে পেয়েছেন। বাগানটি অপরিবর্তিত থাকায় তাঁর মনের মধ্যে একটি স্বস্তি অনুভব হয়েছিল।’’
আজও এই বাগানটি শুধু শুটিংয়ের স্থান হিসেবে পরিচিত নয়, বরং একটি স্মৃতি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরকাল রয়ে যাবে। সেখানকার পরিবেশ, গাছপালা, পাখির কলকাকলি—সবই যেন বলছে বাঞ্ছারামের গল্প অবিরত চলতে থাকবে।
বারুইপুরের সেই বাগান আজও বহন করছে বাঞ্ছারামের বাগান ছবির শুটিংয়ের স্মৃতি, যেখানে শিল্প ও প্রকৃতি একে অপরকে সঙ্গ দিয়ে এগিয়ে চলেছে, আজও।

