Monday, December 8, 2025

বাঁকুড়ার ভোটে ওড়িশার দাপট: উৎকল প্রার্থীদের নিয়ে চতুষ্কোণ লড়াই!

Share

বাঁকুড়ার ভোটে ওড়িশার দাপট

বাঁকুড়ার তালড্যাংরার উপনির্বাচন এবার একটা বিশেষ নজরকাড়া ঘটনা নিয়ে আসছে। একদিকে যেমন চতুর্মুখী লড়াইয়ের পরিবেশ, তেমনই চমক এসেছে প্রার্থীদের পরিচয়েও। তৃণমূল, সিপিএম ও কংগ্রেসের প্রার্থী তিনজনই ওড়িশার উৎকল সম্প্রদায়ের। শুধুমাত্র বিজেপির প্রার্থীই বাঙালি। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৬৯ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তালড্যাংরার বিধায়ক ছিলেন উৎকল সম্প্রদায়ের লোকজনই। তবে গত ৩৭ বছর ধরে সেখানে বাঙালি প্রার্থীরাই নির্বাচিত হয়েছেন। এবার আবার পরিস্থিতি বদলে গেছে।

নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উৎকল প্রার্থীদের দাপট

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে ছিল ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সেখানে তৃণমূলের হয়ে অরূপ চক্রবর্তী, সিপিএমের মনোরঞ্জন পাত্র এবং বিজেপির শ্যামল কুমার সরকার—তিনজনই বাঙালি প্রার্থী ছিলেন। এবার পরিস্থিতি পাল্টেছে। তৃণমূল থেকে ফাল্গুনী সিংহ, সিপিএম থেকে দেবকান্তি মোহান্তি ও কংগ্রেস থেকে তুষারকান্তি ষন্নিগ্রহিকে প্রার্থী করা হয়েছে, যারা তিনজনই ওড়িশার উৎকল সম্প্রদায়ভুক্ত। বিজেপির পক্ষ থেকে একমাত্র বাঙালি প্রার্থী হিসেবে আছেন অনন্যা রায়, যিনি বাঁকুড়ার স্থানীয় বাসিন্দা এবং আগে তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ভোটের অঙ্কে উৎকল সম্প্রদায়ের প্রভাব

তালড্যাংরা বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ ৬৪ হাজার। এর মধ্যে সিমলাপাল ব্লকেই রয়েছেন ১ লক্ষ ৩০ হাজার ভোটার, যেখানে প্রায় ৪৫ শতাংশই উৎকল সম্প্রদায়ের মানুষ। সুতরাং, এই ভোটার গোষ্ঠীর সমর্থন যে কোনও প্রার্থীর জন্য বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও অতীতে বাঁকুড়া এলাকার বাম ভোট বিজেপির দিকে ঝুঁকেছিল, এবার সেই উৎকল ভোটকে ঘিরেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে নানা হিসাবনিকাশ চলছে।

সিপিএম এবার এক নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। হিন্দু ভোটারদের আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে দলটি এবার উৎকল ভোটারদের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। সিপিএম প্রার্থীর বাড়ি লক্ষ্মীসাগর এলাকায়, যেখানে উৎকল সম্প্রদায়ের ভোটারেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য সিপিএম সেখানে ‘গণফোঁটা’র মতো কর্মসূচি চালাচ্ছে, যা ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।

দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন কৌশল

তৃণমূল, সিপিএম এবং কংগ্রেসের প্রার্থীরা প্রকাশ্যে বলছেন, প্রার্থীদের নির্বাচিত করার পেছনে তাদের ভালো মানের প্রার্থী হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং এতে কোনও জাতিগত সমীকরণ নেই। তবে অন্দরমহলে দলগুলো ভিন্ন হিসাব রাখছে। নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উৎকল সম্প্রদায়ের ভোট এক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেটা দলগুলোর কৌশল নির্ধারণে সাহায্য করছে।

তৃণমূলের সাংসদ অরূপ চক্রবর্তী জানান, “আমরা ভালো প্রার্থী বলেই ব্লক প্রেসিডেন্টকে টিকিট দিয়েছি।” তবে তিনিও স্বীকার করেন, তৃণমূল গতবার উৎকল ভোটে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। আর সিপিএমের নেতা অমিয় পাত্র বলেছেন, “আমাদের প্রার্থী একজন শিক্ষক, সমাজে তার পরিচিতি রয়েছে এবং তিনি বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সে কারণেই আমরা তাকে প্রার্থী করেছি।”

প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা ও উৎকল ভোটের সমীকরণ

তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এবার উত্তেজনা ছিল। দলের বিভিন্ন শাখার মধ্যে প্রার্থী বাছাই নিয়ে প্রতিযোগিতা দেখা গেছে। তৃণমূলের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র উৎকল ভোটারদের পছন্দই নয়, এমন একজন প্রার্থী বেছে নেওয়া হয়েছে যিনি দলের মধ্যে সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য। তাই দলীয় অভ্যন্তরে বিতর্ক কমানোর জন্য এমন একজনকে প্রার্থী করা হয়েছে, যিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন।

অন্যদিকে, কংগ্রেসও উৎকল ভোটের সমর্থন পেতে একজন উৎকল সম্প্রদায়ের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। এই সমীকরণ দেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, ভোটের ফলাফলে উৎকল ভোটের প্রভাব অপরিসীম হতে চলেছে।

Read more

Local News