প্রকাশ্যে ভালোবাসার প্রকাশ
মানুষের অনুভূতি এবং ভালোবাসার প্রকাশ সব সময়ই বিশেষ কিছু। কিন্তু যখন এটি প্রকাশ্যে ঘটে, তখন কি সেটি “লোকদেখানো” হয়ে যায়, নাকি এটি ভালোবাসার প্রকৃত রূপ? কবীর সুমনের সাম্প্রতিক মন্তব্যে এই প্রশ্নটি উঠে এসেছে, যেখানে তিনি প্রকাশ্যে চুম্বনের প্রসঙ্গে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন।
চুম্বন ও ভালোবাসার প্রকাশ: সমাজের প্রতিক্রিয়া
একজন মানুষ যখন আরেকজনকে চুম্বন করেন—তা সে পুরুষ-নারী হোক, পুরুষ-পুরুষ, কিংবা নারী-নারী—এটি কি শুধুই ভালোবাসার মধুর প্রকাশ নয়? অথচ, এর চেয়ে স্বাভাবিক এবং সুন্দর আর কী হতে পারে? সমাজের একটি বড় অংশ যেখানে এ রকম অনুভূতির প্রকাশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানায়, সেখানে কবীর সুমন বলছেন, “যাঁরা এটি করেছেন, তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।”
এই যুগে যেখানে মানুষ হানাহানি, বিদ্বেষ আর বিভেদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, সেখানে ভালোবাসার এ ধরনের প্রকাশ যেন নতুন আশার আলো জ্বালায়।
বিবাহে লাজাঞ্জলি এবং ভালোবাসার উদাহরণ
কবীর সুমন উল্লেখ করেছেন হিন্দু বিবাহের একটি বিশেষ অংশ, “লাজাঞ্জলি”। এই রীতিতে নববধূর স্বামী তাঁকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরেন, যা একটি পারস্পরিক সংযোগ এবং ভালোবাসার প্রকাশ। তেমনই খ্রিস্টান বিবাহের ক্ষেত্রেও পুরোহিত বর ও কনেকে চুম্বনের নির্দেশ দেন। এই কাজগুলোও তো প্রকাশ্যে ঘটে, এবং তা সুন্দর বলেই ধরা হয়। তবে সেগুলি নিয়ে আপত্তি কোথাও ওঠে না।
কেন তবে চুম্বনের মতো সাধারণ একটি ভালোবাসার প্রকাশ সমাজের একাংশে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়? এটি কি সংস্কারের নামে এক ধরনের ভণ্ডামি নয়?
ভালোবাসার চুম্বন: যুগের প্রাসঙ্গিকতা
কবীর সুমন বলেন, “আমি যদি কাউকে ভালোবাসি, তা সে ৭৬ কিংবা ৮০ বছরের হোক, ওই মুহূর্তে আমরা পৃথিবীতে একা।” এই বক্তব্য একটি বড় বার্তা দেয়—ভালোবাসা বয়স, স্থান, কিংবা সমাজের বিধিনিষেধ মানে না। বরং ভালোবাসা সব কিছুর ঊর্ধ্বে।
তিনি আরও বলেন, “শীতকালে ভালোবাসার প্রকাশ যেন আরও আনন্দের। ব্রেখটের কবিতার পঙক্তি মনে করিয়ে দেয়, ‘বছর ফুরোতে চলল, ভালোবাসা শুরু হল!’” প্রকৃতির মতোই ভালোবাসা শীতল আবহাওয়াতেও উষ্ণতা এনে দিতে পারে।
ভালোবাসা বনাম লোকদেখানো
অনেকেই মনে করেন, প্রকাশ্যে ভালোবাসার প্রদর্শন আসলে লোকদেখানো। কিন্তু সুমন এ ধরনের চিন্তাভাবনাকে খণ্ডন করেছেন। ভালোবাসার প্রকাশ কখনও লোকদেখানো হতে পারে না। এটি এক ধরনের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ, যা মানুষের মানবিক দিককে তুলে ধরে।
তিনি আরও বলেন, “যাঁরা চুম্বন করেন, তাঁরা কারও কাছে কৃতজ্ঞতা পাওয়ার জন্য এটি করেন না। এটি তাঁদের ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ।”
সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময়
আজকের যুগে যেখানে হিংসা, ঘৃণা আর সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে, সেখানে ভালোবাসার প্রকাশকে বাধা দেওয়ার কোনও যৌক্তিকতা নেই। বরং এটি সমাজকে আরও মানবিক করে তুলতে পারে।
আমাদের উচিত নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো। প্রেম এবং ভালোবাসার মতো বিষয়গুলোকে যদি আমরা উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করি, তবে আমাদের সমাজে আরও অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
সুমনের এই বক্তব্য একবার ভাবতে বাধ্য করে—ভালোবাসা কি সত্যিই এতটা জটিল, নাকি সমাজই এটিকে জটিল করে তুলেছে?

