উস্তাদ জাকির হুসেনের প্রয়াণে
তবলায় হাতের যাদু দিয়ে যিনি বিশ্বজোড়া সুরের মায়াজাল বুনেছিলেন, সেই উস্তাদ জাকির হুসেন আর নেই। ৭৩ বছর বয়সে হার্টের সমস্যা নিয়ে আমেরিকার এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি তবলা-শিল্পী। তাঁর প্রয়াণে সঙ্গীত জগত থেকে রাজনৈতিক মহল এবং টলিউড-বলিউড সর্বত্রই নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
সঙ্গীতের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের অবসান
জাকির হুসেন ছিলেন তবলাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার অন্যতম পথিকৃৎ। পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ এবং পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত এই কিংবদন্তি তিনবার গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। তাঁর তবলার ছন্দ জাতি, ধর্ম এবং ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। তাঁর অমর সৃষ্টিশীলতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে অনেকেই বলছেন, “জাকির হুসেনের সঙ্গে পৃথিবীর একটি তাল হারিয়ে গেল।”
রাজনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়া
উস্তাদের প্রয়াণে শোকবার্তা দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “জাকির হুসেনের মৃত্যু শুধু সঙ্গীত জগতের নয়, গোটা মানব সমাজের এক অপূরণীয় ক্ষতি।” কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং বিজেপি নেতা রাজ্যবর্ধন সিং রাঠোর গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা লিখেছেন, “তাঁর আঙুলের যাদু তবলার উপর এক অনন্য নৃত্যের সৃষ্টি করত। তাঁর সুর চিরকাল পৃথিবীর মনে গেঁথে থাকবে।”
যোগাযোগ মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া টুইট করে লেখেন, “জাকির হুসেনের তবলার ভাষা ছিল আন্তর্জাতিক। এটি বয়স, জাতি, ধর্ম এবং সীমানার বাধা ছাড়িয়ে এক মহাজাগতিক সংযোগ তৈরি করেছিল।”
টলিউড ও বলিউডের প্রতিক্রিয়া
টলিউডের জনপ্রিয় শিল্পী মীর আফসার আলি, নচিকেতার বিখ্যাত গানের একটি লাইন ধার করে আবেগের সঙ্গে লেখেন, “তুমি আসবে বলেই জাকির হুসেন ভুল করে ফেলল তালে… গোটা পৃথিবী তার ছন্দ হারাল।” ইমন চক্রবর্তী একটি ছবি শেয়ার করে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করেন। অভিনেত্রী স্বস্তিকা দত্তও তাঁর প্রয়াণে গভীর শোকপ্রকাশ করেন।
বলিউডের অনেক তারকাই উস্তাদের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। করিনা কাপুর খান উস্তাদকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন, “ম্যাস্ট্রো চিরকাল অমর।” রণবীর সিং তাঁর পুরোনো একটি সাদা-কালো ছবি শেয়ার করে ইমোজির মাধ্যমে শোকপ্রকাশ করেন। ভূমি পেডনেকর এবং রিকি কেজও তাঁদের আবেগঘন বার্তা প্রকাশ করেন।
শিল্প-জগতের প্রতিক্রিয়া
আনন্দ মহিন্দ্রা লিখেছেন, “ভারতের তাল আজ থেমে গেল।” গৌতম আদানি বলেন, “পৃথিবী এমন একটি তাল হারিয়েছে যার বিকল্প নেই। জাকির হুসেনের সুর চিরকাল পৃথিবীতে ঘুরে ঘুরে বাজবে। তাঁর শিল্পের কোনো কালের সীমানা নেই।” শিল্পপতি হর্ষ গোয়েঙ্কাও বলেন, “উস্তাদ ভারতকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য সম্মান এনে দিয়েছিলেন। তাঁর সুর চিরকাল আমাদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে।”
একটি অপূরণীয় ক্ষতি
জাকির হুসেনের চলে যাওয়া কেবল ভারত নয়, গোটা বিশ্বের জন্য একটি অমূল্য ক্ষতি। তবলাকে যিনি আন্তর্জাতিকভাবে একটি শিল্পের মর্যাদা দিয়েছিলেন, সেই কিংবদন্তির সুর বুকে নিয়েই থাকবে পৃথিবী। তাঁর তবলার ছন্দ ছিল শুধু একটি বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ নয়, বরং এক অমর সঙ্গীত।
উস্তাদ জাকির হুসেনের সৃষ্টি এবং অবদান চিরকাল প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর সুরে আজও আমরা নতুন স্বপ্ন দেখার প্রেরণা খুঁজে পাই। উস্তাদকে বিদায় জানিয়ে পৃথিবীর মানুষ একসুরে বলছে, “তাল থেমে গেল, কিন্তু সুর চিরকাল বেঁচে থাকবে।”

