জাকির হোসেনের প্রয়াণে শোকস্তদ্ধ হৈমন্তী শুক্লা
তবলার ছন্দ থেমে গেল। তাল কেটে গেল বিশ্বসঙ্গীত মহলে। প্রয়াত হলেন কিংবদন্তি তবলা শিল্পী উস্তাদ জাকির হোসেন। আমেরিকার এক হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন তিনি। ৭৩ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ ও গ্র্যামি-জয়ী এই তবলা-বাদকের প্রয়াণে সঙ্গীত জগতে যেন এক যুগের অবসান ঘটল।
শিল্পী জাকির হোসেনের মৃত্যু সংবাদে শোকস্তব্ধ সঙ্গীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা। স্মৃতির সরণি বেয়ে ফিরে গিয়েই তিনি বলেন, “খবরটা আমার কাছে বজ্রপাতের মতো মনে হল। ওঁর গুণাগুণ নিয়ে আমার বিশেষ কিছু বলার অধিকার নেই। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার জীবনে তাঁর অনেক প্রভাব ছিল। সঙ্গীত মহলে উনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন, তা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। ও আমায় অসম্ভব ভালোবাসত, আর সেই ভালোবাসা ওঁর বাবার থেকেও পেয়েছি। উস্তাদ আল্লা রাখা সাহেবের কাছে কিছুদিন গান শেখার সুযোগ হয়েছিল। সেই সুবাদে কলকাতায় এলেই জাকির আমায় খুঁজত। ও বলত— দিদি তো দিদিই।”
তিনি আরও বলেন, “একবার এক অনুষ্ঠান ছিল। ও তবলা হাতে তৈরি বাজানোর জন্য। হঠাৎ আমায় দেখতে পেয়ে তবলা ছেড়ে উঠে এসে প্রণাম করল। সেই ছোট ছোট ঘটনাগুলো মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে জীবনের একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেল। আমার ছোট ভাই সিদ্ধার্থর মৃত্যু শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তার মধ্যেই জাকিরের চলে যাওয়ার খবর শুনে যেন পাথর হয়ে গেছি। আমি ভাবতেই পারছি না জাকির নেই। ওর তবলায় হাত পড়লে অন্য কারও তবলা শোনার ইচ্ছেই হত না। ওঁর গুণপনা, ওর ভালোবাসা— এগুলো কোনওদিন ভোলার নয়। আমার পারিবারিক সম্পর্ক ছিল ওর সঙ্গে। ও যে কত ভালো মানুষ ছিল, সেটা ওর ব্যবহারেই স্পষ্ট হত।”
‘একটা যুগের অবসান’— বিক্রম ঘোষের শোক
বাংলার প্রখ্যাত তবলা শিল্পী বিক্রম ঘোষ উস্তাদ জাকির হোসেনের প্রয়াণে শোকজ্ঞাপন করে বলেন, “বলার কিছু নেই। জাকির হোসেনের চলে যাওয়া সত্যিই একটা যুগের অবসান। শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বের সঙ্গীতজগতের জন্য এটা অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি ছিলেন গ্লোবাল আইকন। উনি তবলাকে এমন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন যা অকল্পনীয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব ভেঙে পড়েছি। ওঁর সঙ্গে ভাই-দাদার মতো সম্পর্ক ছিল আমার। আমেরিকায় একসময় আমরা একই বাড়িতে থাকতাম। সেই সময় থেকেই ওঁর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল। ওঁর থেকে জীবনে অনেক কিছু শিখেছি। মঞ্চে শিখিয়েছে কীভাবে পারফর্ম করতে হয়। এমনকি ফিউশন মিউজিকে যাওয়ার ক্ষেত্রেও ওঁর বড় অবদান রয়েছে। তিনি আমায় বলেছিলেন— ‘তোমায় সবার থেকে আলাদা হতে হবে।’”
বিক্রম ঘোষ আরও বলেন, “আমি এখন গোয়ায় আছি। ঠিক এক বছর আগে এই সময় গোয়াতেই আমরা একসঙ্গে সন্ধে কাটিয়েছিলাম। ওঁর আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। অন্তত আরও ১৫ বছর তিনি আমাদের সঙ্গীতজগতকে সমৃদ্ধ করতে পারতেন। এই বয়সে চলে যাওয়া সত্যিই মেনে নেওয়া কঠিন। ভারতবর্ষে এমন শিল্পী কল্পনা করা যায় না। তাঁর মতো একজন তবলা শিল্পী আমাদের সঙ্গীতজগত আর পাবে না। এটা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, গোটা পৃথিবীর সঙ্গীত মহলের এক বিশাল শূন্যতা।”
সঙ্গীতজগতে শোকের ছায়া
উস্তাদ জাকির হোসেনের প্রয়াণে শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর অনন্য প্রতিভা, পরিশ্রম আর ভালোবাসা তাঁকে বিশ্বদরবারে তবলার সম্রাট বানিয়েছে। তাঁর বাজনার জাদুতে তোলা প্রতিটি ছন্দ যেন আজও শ্রোতাদের মনে গাঁথা হয়ে আছে। তাঁর অবদান কোনওদিন মুছে যাওয়ার নয়।
হৈমন্তী শুক্লা ও বিক্রম ঘোষের মতো শিল্পীদের কথায় বারবার উঠে এল তাঁর অবিস্মরণীয় প্রতিভার কথা। তবলার ছন্দে নতুন রূপ এনে জাকির হোসেন আজও কোটি কোটি সঙ্গীতপ্রেমীর হৃদয়ে রাজত্ব করছেন। তাঁর স্মৃতি, তাঁর বাজনার মায়া, এবং তাঁর মানবিকতা অনন্তকাল বেঁচে থাকবে।

