Monday, December 8, 2025

জেলা থেকে শহরের তিনটি হাসপাতালে ঘুরে ভর্তি করানো গেল না শিশুকে, কেন্দ্রীয় রেফারাল ব্যবস্থা কবে চালু হবে?

Share

জেলা কেন্দ্রীয় রেফারাল ব্যবস্থা

বাঁকুড়ার তিন বছরের শিশু অভিষেক রায়ের দুর্ঘটনার ঘটনা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। রবিবার সকালে খেলা করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে গুরুতর আহত হয় অভিষেক। তার পরের ঘটনাপ্রবাহে একের পর এক হাসপাতাল ঘুরেও শিশুটিকে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। একদিকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় রেফারাল ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু না হওয়ার কারণে অভিষেকের পরিবার যে দুঃখজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে, তা প্রমাণ করেছে রোগীভোগান্তি এখনো অব্যাহত।

শিশুটি সকালে বাড়ির উঠোনে খেলছিল, এবং তার বাড়ির সামনে রাখা টোটোর চাবি হঠাৎ ঘুরিয়ে ফেলায় সেটি উল্টে গিয়ে পড়ে তার উপরে। এতে শিশুটির বাঁ কানে গভীর ক্ষত হয় এবং মাথাতেও চোট লাগে। সেসময় অভিষেকের বাবা সোমনাথ রায় সন্তানকে প্রথমে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যান, যেখানে চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, তবে তারা তা করতে পারবেন না। এরপর শিশু অভিষেককে কলকাতার দিকে রেফার করা হয়।

বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ থেকে কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছানোর পরও পরিস্থিতি বদল হয়নি। সেখানে সিটি স্ক্যান করা হলেও, শয্যা ফাঁকা না থাকায় পিজি হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে পাঠানো হয়। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ পিজি হাসপাতাল পৌঁছানোর পরও পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। রাতের বেলা একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে, অভিষেকের পরিবার হতাশ হয়ে পড়ে। শিশুটির ঠাকুরমা, টগরী রায় জানান, রাত দেড়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোথাও শয্যা পাওয়া যায়নি, এবং পরে তাদের ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হয়, কিন্তু সেখানেও একই উত্তর পাওয়া যায়—অস্ত্রোপচার সম্ভব নয়।

এরপর তারা আবারও পিজি হাসপাতালে ফিরে যান, তবে সেখানে চিকিৎসকের কাছ থেকে একই উত্তর পান—শয্যা ফাঁকা নেই, অপেক্ষা করতে হবে। একদিকে হাসপাতালের শয্যার সংকট, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় রেফারাল ব্যবস্থার অদূরদর্শিতার ফলে অভিষেকের পরিবার রাতভর হাসপাতালে ঘুরে বেড়ানোর পর, পরদিন সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ তাকে ট্রমা কেয়ারের আইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে শিশুটি স্থিতিশীল রয়েছে।

এটি অবশ্য একটি অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। বরং, কেন্দ্রীয় রেফারাল ব্যবস্থা চালু না হওয়ার কারণে রাজ্যের হাসপাতালগুলিতে রোগীদের ভোগান্তি একটি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিষেকের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে রেফারাল ব্যবস্থাপনা চালু হলে হয়তো তার পরিবারকে এতটা দুশ্চিন্তা করতে হতো না। স্বাস্থ্যকর্তারা জানান, রাজ্যে কেন্দ্রীয় রেফারাল ব্যবস্থার পাইলট প্রকল্প চলছে এবং সেখানে বিভিন্ন অসুবিধা চিহ্নিত করা হচ্ছে। তবে পুরো ব্যবস্থাটি চালু হতে এখনও কিছুটা সময় লাগবে।

রাজ্যের কার্যনির্বাহী স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা অনিরুদ্ধ নিয়োগী জানান, বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে কেন্দ্রীয় রেফারাল ব্যবস্থা চলছে, এবং এর মধ্যে নানা সমস্যা চিহ্নিত করা হচ্ছে। সংশোধনের পরে পুরোপুরি এই ব্যবস্থা চালু হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো রোগীকে এমন সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয়। তবে, এসএসকেএম হাসপাতালের এক কর্তার মতে, সাধারণত বাচ্চাদের ফেরত পাঠানো হয় না, কিন্তু শয্যা ফাঁকা না থাকলে কিছু করার থাকে না। অভিষেকের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল, এবং পরে শয্যা পাওয়ার পর তাকে ভর্তি করা হয়।

এই ঘটনা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা এবং কেন্দ্রীয় রেফারাল ব্যবস্থার অপ্রতুল কার্যকারিতার বিষয়টি আবারও সামনে আনলো। এতে প্রমাণিত হয়, একদিকে হাসপাতালগুলির শয্যা সংকট, অন্যদিকে সঠিক রেফারাল ব্যবস্থা না থাকার কারণে বহু রোগীকে প্রাণপণ সংগ্রাম করতে হয় চিকিৎসার জন্য। এখন সময় এসেছে, এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরী এবং রোগী বান্ধব করতে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারের সদস্য এমন দুঃখজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি না হন।

Read more

Local News