Monday, December 8, 2025

আরজি কর আন্দোলন: তিন মাসের পর্যালোচনা ও অর্জন-অপ্রাপ্তির খতিয়ান

Share

আরজি কর আন্দোলন

২০২৪ সালের আগস্টে আরজি কর হাসপাতালে এক মহিলা চিকিৎসকের ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনার পর শুরু হওয়া আন্দোলনটির পরিসমাপ্তি এখনও হয়নি। তিন মাসের টানাপড়েনের মধ্যে এই আন্দোলন বিভিন্ন দিক থেকে আলোচিত হয়েছে। প্রথমে, জুনিয়র চিকিৎসকদের দাবি ছিল নির্যাতিতার বিচার এবং চিকিৎসক-নার্সদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পরবর্তীতে, এই দাবির তালিকায় আরও কিছু বিষয় যোগ হয়।

আন্দোলনকারীরা ১২ দফা দাবি নিয়ে পথে নেমেছিল। তাদের দাবিগুলির মধ্যে একটি ছিল নির্যাতিতার পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ, তবে এই দাবি পরে বাদ পড়ে। বাকি ১১টি দাবির মধ্যে বিচার, হাসপাতালের নিরাপত্তা, নির্যাতিতার পরিবারকে ন্যায্যতা প্রদান, এবং চিকিৎসকদের জন্য অধিকতর সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অন্তর্ভুক্ত ছিল। আন্দোলনটি এতটাই তীব্র হয়েছিল যে, রাজ্যজুড়ে ব্যাপক জনসমর্থন পায়। সেই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বহু নাগরিক বিভিন্ন মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিন মাসের মাথায় আন্দোলনকারীরা তাদের প্রাপ্তি এবং অপ্রাপ্তির হিসাব করছেন।

আন্দোলনের শুরু এবং সিভিক ভলান্টিয়ারের গ্রেফতার

আরজি কর হাসপাতালের ওই ঘটনা শুরু হয় যখন এক মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুনের শিকার হতে হয়। শুরুতে, পুলিশের তদন্তের ওপর প্রশ্ন উঠেছিল, এবং আদালতের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব নেয় সিবিআই। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তারা প্রাথমিকভাবে ‘তথ্যপ্রমাণ লোপাট’ করতে সাহায্য করেছিল। এর ফলে আরজি কর হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মন্ডলকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তারা জেল হেফাজতে রয়েছেন। তবে, সিবিআইয়ের চার্জশিটে শুধুমাত্র একজনকে দায়ী করা হয়েছে, যা আন্দোলনকারীদের একাংশের পছন্দ হয়নি। তারা দাবি করছেন যে, একাধিক ব্যক্তি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল।

আন্দোলনের কটাক্ষ এবং সমর্থন

এমনকি আন্দোলনের সময় শহর কলকাতার বিভিন্ন স্থানে ‘নাগরিক আন্দোলন’ লক্ষ্য করা গেছে। ১৪ অগস্ট সারা রাজ্যে ‘মেয়েদের রাত দখল’ কর্মসূচি পালন করা হয়, যেখানে বহু মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। এই সময়েই আরজি কর হাসপাতালে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনটি পুরো রাজ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে সেলিব্রিটি-রাজনীতিবিদরা এতে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী মানুষ এবং চলচ্চিত্রের খ্যাতনামা ব্যক্তিরাও আন্দোলনে যুক্ত হন। অভিনেত্রী অপর্ণা সেন এবং ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত বিক্ষোভে যোগ দিতে চেয়েছিলেন, তবে এর মধ্যেই অপর্ণাকে ‘চটিচাটা’ স্লোগান শুনতে হয়, এবং ঋতুপর্ণার গাড়ির ওপর হামলা চালানো হয়।

আন্দোলনের রাজনৈতিক দিক

এই আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলিরও সংশ্লিষ্টতা ছিল। বিজেপি প্রথমে আন্দোলনের নেতৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পরিণত হয়। সিপিএম আন্দোলনে অংশগ্রহণ করলেও তারা এটি রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেনি। তারা শুধুমাত্র আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে আন্দোলনের পক্ষে ছিল। তবে জুনিয়র ডাক্তাররা তাদের আন্দোলনকে ‘অরাজনৈতিক’ রাখার চেষ্টা করেছেন, এবং কিছু ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছেন।

আদালতের ভূমিকা

এমনকি আন্দোলনের মধ্যে কলকাতা হাই কোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আন্দোলন চলাকালীন, পুলিশি হস্তক্ষেপ এবং গ্রেফতারকৃত আন্দোলনকারীদের জামিন আদালতের মাধ্যমে হয়েছিল। আন্দোলনকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে নানা রকম চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন, যা সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক পদক্ষেপের সৃষ্টি করে।

আন্দোলনের কোলাহল

এই তিন মাসে, আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন, যার মধ্যে জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতি, লালবাজার অভিযান, এবং হাসপাতালের সামনে অবস্থান নেওয়া ছিল। জুনিয়র ডাক্তাররা একদিকে যেমন সরকারের ‘পিছু হটানো’ দেখেছেন, তেমনি কখনও ‘নমনীয়’ হতে হয়েছে তাঁদের। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু দাবিতে সমর্থন দেওয়া হলেও কিছু ক্ষেত্রে সরকার ‘কঠোর’ থেকেছে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকের পর, জুনিয়র ডাক্তাররা কিছু দাবি মেনে নিতে সম্মত হন। তবে আন্দোলন শেষ হয়নি। চিকিৎসকদের সংগঠন জানিয়েছিল যে, আন্দোলনটি শুধুমাত্র ‘অংশিকভাবে’ শেষ হয়েছে এবং তারা আরও কিছু দাবির জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন।

আন্দোলনের ভবিষ্যত

অবশেষে, আন্দোলনকারীরা ২১ অক্টোবর নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার পর অনশন তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও তাঁরা জানিয়েছেন যে, অনশন উঠলেও আন্দোলন থেমে যাবে না। তবে, আন্দোলনের গতি কিছুটা স্তিমিত হয়েছে এবং নাগরিক আন্দোলনের ‘ঝাঁজ’ও কমেছে। তবে, আন্দোলনের মধ্যে তৈরি হওয়া সরকারবিরোধী ‘ক্রোধ’ এখনও রয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলি এই ক্রোধের উপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।

এই আন্দোলনটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ শুধু এক চিকিৎসকের হত্যাকাণ্ডের বিচার চায়নি, বরং চিকিৎসকদের নিরাপত্তা এবং সমাজের ন্যায়বিচারের দাবিতেও সোচ্চার হয়েছে।

Read more

Local News