আমার সঙ্গে আরিফিনের অভিনয়
প্রয়াত ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি পরিচালক শ্যাম বেনেগাল, যাঁর সিনেমাগুলো ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন দিককে প্রকাশ করেছে, সম্প্রতি আমাদের মাঝে আর নেই। তাঁর প্রয়াণে বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই শোকের মধ্যে, অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত শ্যাম বেনেগালের সঙ্গে কাজের স্মৃতি শেয়ার করেছেন এবং তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। ঋতুপর্ণার মতে, শ্যাম বেনেগালের প্রতিটি সিনেমা ছিল একটি ‘রত্ন’, যা মানুষের কথা বলেছে এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছে।
ঋতুপর্ণা ও শ্যাম বেনেগাল: এক সৃজনশীল সম্পর্ক
ঋতুপর্ণা বলেন, “শুধু শ্যামজি নয়, তাঁর প্রতিটি ছবি ছিল এমন এক মহাকাব্য, যেখানে মানুষের গল্প বলা হয়েছিল, যেখানে প্রতিটি চরিত্র ছিল জীবন্ত। তাঁর ছবি শুধু দেখতে নয়, অনুভব করতে হবে। যেখানে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা হয়েছে, আর মানুষকে নিজের মতো করে বাঁচার সাহস দেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আমি শ্যামজির বহু ছবির এক অনুরাগী ছিলাম। তাঁর ‘অঙ্কুর’, ‘মান্ডি’, ‘ভূমিকা’, ‘মন্থন’, ‘জুনুন’, ‘আরোহন’ এবং ‘মাম্মো’ সিনেমাগুলো মনে রাখার মতো। এসব ছবি আজও দর্শকদের মনে অমলিন হয়ে রয়েছে।”
‘মুজিব’ ছবির অভিজ্ঞতা
২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শ্যাম বেনেগালের শেষ ছবি ‘মুজিব: দ্য মেকিং অফ এ নেশন’ নিয়ে ঋতুপর্ণা তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এ ছবির মধ্যে শ্যামজি তাঁর স্বকীয়তা বজায় রেখেছিলেন। এটি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক গল্প নয়, বরং একটি মানবিক গল্পও ছিল।” ঋতুপর্ণার মতে, ‘মুজিব’ ছবির জন্য শ্যাম বেনেগাল আরিফিন শুভকে নির্বাচন করেছিলেন কারণ শ্যামজি ‘আহারে’ ছবিতে তাঁর সঙ্গে আরিফিনের অভিনয় দেখেছিলেন। সেই অভিনয়ের মাধ্যমে শ্যামজি আরিফিনকে নির্বাচন করেছিলেন, যা সত্যিই একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল।
আরিফিন শুভ ও শ্যাম বেনেগালের সম্পর্ক
ঋতুপর্ণা আরও জানিয়েছেন, “শ্যামজি আরিফিনের অভিনয়ের প্রতি একরকম আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। ‘আহারে’ ছবিতে তাঁর অভিনয়ের পর, শ্যামজি সিদ্ধান্ত নেন যে আরিফিন শুভই ‘মুজিব’ চরিত্রের জন্য উপযুক্ত। তাঁর অভিনয় গভীরতা এবং চরিত্রের প্রতি নিষ্ঠা দেখে, শ্যামজি জানতেন যে এই চরিত্রটি অনবদ্য হবে।” এই ছবিতে আরিফিন শুভ বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের একটি অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে গণ্য হয়।
শ্রদ্ধা ও স্মৃতির বাতাস
ঋতুপর্ণা জানেন, শ্যাম বেনেগালের মতো নির্মাতাদের চলে যাওয়ার পর তাদের সৃষ্টি থেকেই অমরত্ব লাভ করা সম্ভব। “যারা চলে গেছেন, তাঁরা রেখে গেছেন অজস্র মণিমুক্তো-সম সৃষ্টি। এই সৃষ্টির মধ্যে তাঁদের অবদান চিরকাল অমলিন থাকবে। শ্যামজি যেমন আমাদের প্রেরণা দিয়েছেন, তেমনি তাঁর ছবি আজও আমাদের পথপ্রদর্শক।” ঋতুপর্ণা বিশ্বাস করেন, শ্যাম বেনেগালের সৃষ্টি একদিকে যেমন বাংলা ও হিন্দি সিনেমাকে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে, তেমনি সেই সৃষ্টি একদিন চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।
উপসংহার
প্রয়াত শ্যাম বেনেগাল শুধু ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্যই নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের জন্য এক অমূল্য রত্ন। তাঁর কাজের মধ্যে, ঋতুপর্ণার মতো অভিনয়শিল্পীরা সুযোগ পেয়ে নিজেদের শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। ‘মুজিব’ ছবিতে শ্যাম বেনেগালের নির্দেশনায় আরিফিন শুভ ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের অভিনয় আজও দর্শকদের মনের মধ্যে অমলিন স্মৃতি হিসেবে রয়েছে। শ্যাম বেনেগালের মতো এক মহান নির্মাতার অবদান চলচ্চিত্র জগতে চিরকাল অমর থাকবে, আর তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে আমরা তাঁর মহানত্বকে প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতে পারি।

